নিউইয়র্কের থার্টি সিক্স এভিনিউতে কোজাকের মাফিয়ারা নেই আছেন বাঙালি ব্যবসায়ীরা
আনর্তজাতিক খবর
মঙ্গলবার, 21 মে 2013 01:50
নিউইয়র্ক: টেলিভিশন সিরিজ কোজাকের কথা অনেকেরই মনে আছে। সংঘাত, সংঘর্ষ, জুয়া, যৌণতা, মাদক আর মদে মত্ত মাফিয়ার বিরুদ্ধে লড়তেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। সেই কোজাকের দৃশ্য চিত্রায়ন হতো প্রায়শঃই নিউইয়র্কের থার্টি সিক্স এভিনিউতে। এই সেদিনও এটি ছিলো অনেকটাই ফাঁকা একটি জনবসতি। ছিলো গুটি কয়েক লো-টেক ইন্ডাস্ট্রি। নিউইয়র্কের ক্রাইম জোন হিসেবেই পরিচিত ছিলো থার্টিসিক্স এভিনিউ। দিনে দুপুরে গুলি হতো। অন্যত্র থেকে ধরে এতে হত্যার জন্যও ছিলো এটি একটি নিরাপদ জোন।
সেই কোজাকের থার্টি সিক্স এভিনিউ এখন একটি ভদ্রপল্লী। এখানে দিনে দিনে অভিজাতদের বসবাস শুরু হয়েছে। এখন এখানে জমজমাট ব্যবসা আর দোকান পাট। আর এগুলোর বেশিরভাগই বাংলাদেশিদের। বলা যায় থার্টিসিক্স এভিনিউকে নতুন রূপ দিয়েছেন বাংলাদেশিরাই।
কথাগুলো বেশ গর্বের সঙ্গেই বলছিলেন বাংলাদেশি ফার্মেসি ব্যবসায়ী সাহাব আহমেদ। তিনি বলেন, আমি যখন এখানে ব্যবসা শুরু করি তখনো মাফিয়াদের দৌরাত্ম ছিলো। মাফিয়াদের বসকে চিনতাম, দেখতাম প্রকাশ্যে বন্দুক নিয়ে বসে আছেন। বছর তিন চারেক ধরে পুরোপুরি বিছানায় পড়ে রয়েছেন।

থার্টিসিক্সে কিভাবে ব্যবসা শুরু করলেন জানতে চাইলে সাহাব আহমেদ বলেন, খুবই ঝুকিপূর্ণ ছিলো কিন্তু আমার মনে হয়েছিলো এলাকাটি এমন থাকবে না। তাই অন্যত্র থেকে ব্যবসা তুলে এখানে নিয়ে আসি। তখন এখানে কোনো ওষুধের দোকান ছিলো না। আমার মনে হয়েছিলো ব্যবসা চলবে। তখন এখানে রিটেল শপ বলতে আমার একটাই ছিলো বাকিগুলো ছিলো সার্ভিসভিত্তিক যেমন লন্ড্রিশপ ইত্যাদি। পরে তো ধীরে ধীরে থার্টি সিক্স এভিনিউ বাঙালিদের বলা যায় একরকম দখলেই চলে এসেছে, বলেন তিনি।
সাহাব আহমেদ যখন যাত্রা শুরু করেন তখন বাংলাদেশির মালিকানায় একটি গ্রোসারি শপ এখানে ছিলো নাম বিআইপি। এছাড়া মোট ১০/১২টি দোকান এই এভিনিউতে ছিলো। প্রায় সবগুলোই ছিলো অন্যদের মালিকানায়। এখন এভিনিউর দুপাশে শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এভিনিউ ধরে হাঁটলে দেখা যায় বেশিরভাগই বাংলাদেশিদের মালিকানায়।
থার্টিসিক্সের নেইবারহুডেও রয়েছে অনেক বাঙালির বাস।
সাহাব আহমেদ বলেন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও মসজিদ ঘিরে গড়ে উঠেছে এই আবাস। পুরো অ্যাস্টোরিয়া এলাকায় বাঙালি মুসলমানদের একটি বড় কমিউনিটি বাস করে যেটি গড়ে ওঠে আল-আমিন মসজিদকে কেন্দ্র করে। আর থার্টি-সিক্স এভিনিউর ওপরেও রয়েছে আল-বার মসজিদ।
কতজন বাংলাদেশির বসবাস থার্টিসিক্স এভিনিউতে এমন প্রশ্নে তিনি জানান, ৫ হাজার পরিবারের বাস এই এলাকায়। তাদের সদস্য সংখ্যা ২০ হাজারের বেশি হবে। তার নিজেরই কয়েক হাজার বাংলাদেশি কাস্টমার রয়েছে বলে জানান সাহাব আহমেদ।
থার্টিসিক্স এভিনিউতে সকাল-বিকেল-রাতে বাঙালিদের আনাগোনাই চোখে পড়ে। এই এভিনিউর ওপরে নামকরা ডাচ কিলস স্কুলগামীদের মধ্যে বাংলাদেশি শিশু-কিশোর-কিশোরীদের চেহারা বেশ চোখে পড়ে। এই স্কুলে বাংলাদেশি শিশুদের প্রসঙ্গে এর প্রিন্সিপ্যাল রাফায়েল ক্যাম্পোস সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে বলেছিলেন, এই শিশুরা বেশ মেধাবী ও স্মার্ট। ক্যাম্পোস বলেন শিশুরা ভালো করছে কারণ তাদের বাবা-মায়েরা ভালো এবং সর্বোপরি বাংলাদেশি কমিউনিটিও ভালো।
থার্টিসিক্স এভিনিউতেই গড়ে উঠেছে আরকিউএম নামে একটি টিউটোরিয়াল। এই টিউটোরিয়ালের শিক্ষার্থীরা এবছর হাই-স্কুল অ্যাকসেপট্যান্স পরীক্ষায় শতভাগ সাফল্য দেখিয়েছে। এভিনিউ ধরে হাটলে প্রতিটি ক্রসরোডের কর্নারে ডেলি অ্যান্ড গ্রোসারি। একসময় এই দোকানগুলো গ্রিক ও ইটালিয়ানদের দখলে ছিলো। এখন ভেতরে ঢুকলেই দেখা যায় বাঙালি এবং বাংলাদেশিরাই সেসব দোকানের মালিক।
থার্টি সিক্সের প্রধান আকর্ষণ আলাদিন রেস্তোরা। এই রেস্তোরার সুনাম ছড়িয়ে আছে গোটা নিউইয়র্ক জুড়ে। কেবল নিউইয়র্কই নয়, আশে পাশের নিউ জার্সি, আটলান্টা, কানেটিকাট থেকে প্রায় প্রতিদিনই কাস্টমার আসে আলাদিন রেস্তোরার খাবার খেতে। আর দেশ থেকে কিংবা দূরের অন্য কোনো স্টেট কেউ বেড়াতে এলে আলাদিনের খাবার একবেলা খাবেনই। এই দাবি আলাদিন কর্তৃপক্ষের। কাস্টমারদের ভিড় লেগেই থাকে। ইদানিং বিদেশি ক্রেতাও ভিড় জমায়। ১৯৯৫ এর মার্চে শুরু হলেও ২০০৫ সালের দিকে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে আলাদিন। এর পর থেকে এই আলাদিনকে ঘিরেই জমজমাট হয়ে ওঠে থার্টিসিক্স এভিনিউ। একজন কাস্টমার বলেন, আলাদিনের সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে এরা বাসি খাবার বিক্রি করে না। আর দেশি স্বাদের খাবার এই দেশে খেতে পারার সুযোগ কে না নেয় বলুন।
আলাদিনের পাশেই আরেকটি দোকান আনন্দ রেস্তোরা। তার পাশে আরেকটি বাংলাদেশি গ্রোসারি। একটি ফলের দোকান, একটি মনোহরি। আশে পাশে ১০-১২টি দোকানের মধ্যে একটি দোকানই পাওয়া গেলো যেটি কেবল পাকিস্তানি মালিকানাধীন।
আলাদিনের উল্টোদিকে ডেলি অ্যান্ড গ্রোসারি, আমিন ফার্মেসি, কবির’র বেকারি, সোনার বাংলা হেয়ারকাটিং, বনফুল গ্রোসারি, ডেনটিস্ট্রি নামে দন্তচিকিৎসকের চেম্বার।
কথা হয় সোনার বাংলার শান্তিরঞ্জন শীলের সঙ্গে। ১৯৯৯ সাল থেকে থার্টিসিক্সে এই ব্যবসা তার। দেশে গোলাপগঞ্জ থেকে চুল কাটায় দক্ষতা নিয়েই এদেশে আসেন শান্তিরঞ্জন শীল। ১৯৯৫ সাল থেকে অন্যের দোকানে কাজ করতেন, ৯৯ এ নিজের ব্যবসা শুরু করেন। শান্তিরঞ্জন জানান, ব্যবসা ভালো। বাংলাদেশিরাই তার প্রধান কাস্টমার তবে বিদেশিরাও রয়েছে। ছেলে ও মেয়ে উভয়ের চুলই কাটা হয়। সোনার বাংলা হেয়ার কাটিংয়ে দেখা গেলো এক বাংলাদেশি কাস্টমারের চুল বেশ যতেœর সঙ্গে কেটে দিচ্ছেন দোকানের এক বিদেশিনী কর্মচারী।
একটি ক্রস রোড পাড় হলেই সাহাব আহমেদের বিশাল ফার্মেসি। সাবওয়ের কর্নারে ডানকিন ডোনাট ও সাবওয়ে নামে দুটি চেইন ফুড শপ। যুক্তরাষ্ট্রের সব জায়গায়ই এটা দেখা যায়। আরেকটি দোকান একটু পরপরই চোখে পড়ে ৯৯ সেন্ট। এসব দোকানের মালিকানাও বাংলাদেশিদের হাতে আসছে একটি দুটি করে। নিউ হ্যাপী ডেলি গ্রোসারি, বিআইপি গ্রোসারি রয়েছে এদিকটাতে। বিআইপি গ্রোসারি থার্টি সিক্সে প্রথম বাংলাদেশি দোকান। তবে এখন আর পুরোনো মালিক নেই। নতুন মালিকানায়ও একই ব্যবসা চলছে। ফ্রিডম ডেলি গ্রোসারি। স্বাধীনতাকে নিজের ব্যবসার নামে টেনে আনবে এমনটা একজন বাংলাদেশিই করবেন কারণ যুদ্ধ করে স্বাধীনতা এনেছে এই জাতি।
সুন্দরবন রেস্তোরা নামেই বাংলাদেশি। থার্টিসিক্স এভিনিউতে এদের ব্যবসাও এখন জমজমাট। প্রায়শই সভা, সেমিনারও হয় এই রেস্টুরেন্টে। পাশেই ক্লাব সনম। বড় কোনো অনুষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশি কমিউিনিটি এই ক্লাবকেই বেছে নেন।
উল্টোদিকে আরেকটি দোকান ‘কেনাকাটা’। নামই টেনে ভেতরে ঢোকালো। সিমছাম গোছানো দোকান একটু পরপরই ছোট ছোট বাচ্চা ক্রেতারা ঢুকছে। কারো ক্যান্ডি কারো আইসক্রিম কারো সফট ড্রিঙ্কস প্রয়োজন। অধিকাংশই বিদেশি ছেলে মেয়ে। হাসিমুখে সেগুলো তুলে দিচ্ছেন বিক্রেতা সিলভিয়া নাসরিন। বয়স ৫০ এর কোটায়। মনে হচ্ছিলো এই শিশুরা যেনো তার অত্যন্ত আপনজন। শিশুরাও তার ভীষণ ভক্ত বলে মনে হলো। সিলভিয়া নাসরিন জানালেন দোনটি আগে ঠাঁঠারিবাজার নামে ছিলো। ১৯৯৮ সাল থেকে এটি কেনাকাটা নামে চলছে। তারা দোকানটি কিনে নিয়েছেন ছয় বছর আগে। তিনি বলেন, ছেলে মেয়েরা বড় হয়ে গেছে। এখন আমরা স্বামী-স্ত্রী মিলে দোকানটি চালাই। আমার ভীষণ ভালো লাগে, সারাদিন এখানে কেটে যায়। বাংলাদেশি কাস্টমাররা আসে, আসে বিদেশিরাও তাদের সঙ্গে একটা আন্তরিক সম্পর্ক হয়ে গেছে। ফলে দিনটা ভালো কেটে যায়। বাংলাপত্রিকাসহ বিভিন্ন পত্রিকাও বিক্রি হয় সিলভিয়া নাসরিনের দোকানে। তিনি জানালেন এখানে বিদেশি ক্রেতারাও মাঝে মধ্যে বাংলাপত্রিকা কিনতে চায়। তারা এখান থেকে বাড়িভাড়া, এটা সেটা বিক্রির বিজ্ঞাপনের বিষয়ে আগ্রহ দেখান। মাঝে মধ্যে বাংলাদেশের খবরও জানতে চান। আমি তাদের ট্রান্সলেট করে শোনাই। ভাড়ার বিজ্ঞাপনগুলো লিখে দেই। এখানকার সস্তা বাড়ি খোঁজে তারা।
থার্টিসিক্স-এ ইদানিং বাড়িভাড়া বেশ বেড়েছে একথা জানিয়ে সিলভিয়া নাসরিন বলেন, ক্রমশই এলাকাটি বাংলাদেশিদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে অনেকেই থার্টি সিক্স ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। একই কথা বলেছেন সাহাব আহমেদ, শান্তিরঞ্জন শীলও।
থার্টিসিক্স এভিনিউ থেকে বাংলাদেশিদের সরে যাওয়ার বিষয়টি তারা মোটেই মেনে নিতে পারছেন না।