নতুন প্রজন্ম
হ-বাংলা নিউজ : ঢাকা থেকে : মেরুদণ্ডী প্রাণী ব্যাঙের নতুন 'জেনাস' ও 'প্রজাতি' আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে বিশ্ব জীববৈচিত্র্যে নাম লেখাল বাংলাদেশ। তা সম্ভব করেছে ২৭ বছর বয়সী সাজিদ আলী হাওলাদারের গবেষণাকর্ম। এর সুবাদে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ প্রাণিবিজ্ঞানীর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়ে গেলেন বাংলাদেশের এই তরুণ। আর এ খবরের সতেজতায় আজ বুধবার অন্য সব দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস।
ভারতীয় উপমহাদেশে বিচরণ করে এমন কিছু ব্যাঙের ওপর ছয় বছর ধরে গবেষণা কার্যক্রম চালান প্রাণিবিজ্ঞানী সাজিদ। অবশেষে সাফল্য ধরা দেয়। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রাণীটির নতুন 'প্রজাতি' আবিষ্কার করেন তিনি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বের করতে সক্ষম হন 'জেনাস'। নতুন জেনাসের নামকরণ হয় Frog Zakerana আর প্রজাতির নাম 'ফেজারভেরিয়া আসমতি'। বিশ্বের উভচর প্রাণীর শ্রেণীবিন্যাস নামকরণের স্বীকৃতিদানকারী প্রতিষ্ঠান 'আমেরিকান মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রি' সাজিদের নতুন আবিষ্কারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফলে এখন থেকে পৃথিবীর সব দেশের গবেষকরাই নতুন এই নাম ব্যবহার করতে মোটামুটি বাধ্য।
কথা হয় বিশ্ব প্রাণিবিদ্যায় নাম লেখানো সাজিদের সঙ্গে। কিছুটা উদাস প্রকৃতির এই তরুণের বাড়ি বরিশাল। পড়াশোনা করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০১১ সালে এই প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি প্রাণিবিদ্যা বিভাগে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছেন ঢাকা নৌবাহিনী কলেজ থেকে। ক্যাম্পাসের প্রিয় এই ছাত্র সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়তেন কঙ্বাজার, বরিশাল, খাগড়াছড়িসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে। লক্ষ্য একটাই- নতুন নতুন ব্যাঙ খুঁজে বের করা।
সাজিদ হ-বাংলা নিউজকে বলেন আবিষ্কারের শুরুর দিকের কাহিনী। ২০০৮ সালের ১৫ মে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে সাজিদ নিজ ক্যাম্পাসে পাওয়া একটি ব্যাঙ সংগ্রহ করে তা ব্যক্তিগত গবেষণাগারে রাখেন। তারপর ব্যস্ত হয়ে পড়েন লেখাপড়া নিয়ে। এক পর্যায়ে জানতে পারেন, তখন পর্যন্ত ব্যাঙের সাড়ে ৬০০ প্রজাতি আবিষ্কার হয়েছে পৃথিবীতে। কিন্তু নিজের সংগ্রহশালায় থাকা ব্যাঙটি ওই আবিষ্কারের তালিকায় নেই। এ অবস্থায় তিনি ব্যাঙটিকে ঘিরে আগ্রহী হয়ে পড়েন। নেমে পড়েন গবেষণায়।
সাজিদের সংগ্রহে থাকা ব্যাঙটি ডাকে ভিন্ন স্বরে। বৈশিষ্ট্যও অন্য সব ব্যাঙের চেয়ে আলাদা। এর কারণ জানতে তিনি পর্তুগাল, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপানসহ বিশ্বের সেরা সেরা প্রাণিবিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলেন। শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত হন যে পৃথিবীতে এ পর্যন্ত পাওয়া ব্যাঙের তালিকায় এই প্রজাতির ব্যাঙের অস্তিত্ব নেই। তাঁর গবেষণার ফল পাঠানো হয় নিউজিল্যান্ডে। সেখানকার বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ পর্যালোচনা শেষে আন্তর্জাতিক প্রাণিবিদ্যা গবেষণাবিষয়ক সাময়িকী 'জুটেক্স'-এ একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। সেখানে বলা হয়, ব্যাঙটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩০ মিলিমিটার। পরিচিত ব্যাঙের স্বরের চেয়ে এটি কিছুটা ভিন্ন সুরে ডাকে। পিঠে লালচে ছোপ আছে। শরীরের মাঝ বরাবর আছে একটা সাদা রেখা। গলার নিচের চামড়া নিচের দিকে ঝুলে থাকে। অবশেষে সেই ব্যাঙের নাম হয় 'ফেজারভেরিয়া আসমতি'।
বড় ঘটনাটি ঘটে চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি। এতকাল ধরে 'ফেজারভেরিয়া' নামে ব্যাঙের যে জেনাসটির কথা উল্লেখ রয়েছে, সেটি ভুল প্রমাণ করলেন সাজিদ। টানা ছয় বছরের অনুসন্ধানে তিনি বের করলেন- প্রায় ১৮ শতকের দিকে নামকরণ হওয়া এ জেনাসটির নাম ও বৈশিষ্ট্যের মধ্যে বৈসাদৃশ্য রয়েছে, শ্রেণীবিন্যাসও সঠিক নয়। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার ও পাকিস্তানে বিচরণ করা এই জেনাসের অসংখ্য ব্যাঙের ওপর গবেষণা করে প্রতিবেদন পাঠানো হয় আমেরিকান মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে। তারা অনেক যাচাই-বাছাই শেষে সাজিদের গবেষণার সত্যতা পায়। গত ৯ জানুয়ারি সংস্থাটি নিজেদের সাময়িকীতে সাজিদের নতুন জেনাস আবিষ্কারের তথ্য প্রকাশ করে।
সাজিদ তাঁর আবিষ্কৃত জেনাসের নাম দিয়েছেন 'জাকেরানা'। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত কাজী জাকের হোসেনকে উৎসর্গ করে তিনি ব্যাঙটির নামকরণ করেন ঋৎড়ম তধশবৎধহধ। নিজের হাতে এই শ্রেণীভুক্ত প্রাণীর জেনাস পরিবর্তন হওয়ায় এখন ওই প্রজাতির প্রকৃত নাম হবে 'জাকেরানা আসমতি'। তিনি প্রজাতিটির নামকরণ করেছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. গাজী সৈয়দ মোহাম্মদ আসমতের সম্মানে।
জেনাস বা গণ হচ্ছে ব্যাঙের একটি দল, আর অনেক প্রজাতি মিলে একটি জেনাস। সাজিদের আবিষ্কৃত ব্যাঙের এ জেনাসের আওতায় রয়েছে ২০টি প্রজাতি। 'জাকেরানা' ও 'আসমতি' ছাড়াও সাজিদ ২০০৭ সালে আবিষ্কার করেছেন পাঁচটি ভিন্ন প্রজাতি।
গবেষক ড. গাজী সৈয়দ মোহাম্মদ আসমত বলেন, 'দেড় শ' বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো বাংলাদেশি মেরুদণ্ডী প্রাণীর নতুন জেনাস ও প্রজাতি আবিষ্কার করল। সাজিদের এই স্বীকৃতি বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে। আমেরিকান মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রি নতুন এই জেনাসের স্বীকৃতি দেওয়ায় বিশ্বের সংশ্লিষ্ট সব ক্ষেত্রেই নতুন নামটি ব্যবহার করার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে।'
সাজিদ হ-বাংলা নিউজকে বলেন, জেনাস ও প্রজাতি আবিষ্কার করতে গিয়ে দুই বছর ধরে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের হাজারো প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বিলুপ্ত কোনো প্রাণীর ফসিল নিয়ে গবেষণা করে তার বয়স বের করেন। তবে ডিএনএ থেকে তথ্য নিয়ে কোনো প্রজাতির টিকে থাকার সময় হিসাব করা গেলে তা প্রাণিবিদ্যায় অভূতপূর্ব সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে। আর বর্তমান সময়ে ব্যাঙ সর্বাধিক অস্তিত্ব-ঝুঁকিতে রয়েছে।