Type in:

প্রবাসী লেখকদের কলাম

ফেইসবুকে একটি ভালবাসার মৃত্যু

( 0 Votes )

প্রবাসী লেখকদের কলাম


ফারুক আহমেদ : পার্থ, অস্ট্রেলিয়া থেকে : পাশের বাসার বড়ভাইটি দিনরাত একই গান বাজাতেন, ‘তোমার বাড়ির সামনে দিয়ে আমার মরণযাত্রা যেদিন যাবে, তুমি বারান্দাতে দাঁড়িয়ে থেকো শেষ দেখাটি দেখতে পাবে’। আমি তখন কিশোর, গোঁফ উঠি উঠি করছে। সেই সময়ের ঢাকা প্রথম বিভাগ ফুটবলের মাঠ কাঁপানো আক্রমণ ভাগের খেলোয়াড়ের মরণযাত্রার ইচ্ছার বিষয়ে আমার কৌতূহল ছিল না, কিন্তু কৌতূহল ছিল কী করে একই গান বিরতিহীন বাজানো যায়। একদিন গলির মাথায় তাকে পেয়ে জেনে নিলাম তিনি একই গান ক্যাসেটের এপিঠ-ওপিঠ দুই পিঠেই কুড়ি বার রেকর্ড করিয়েছেন। কী দারুণ বুদ্ধি! আমার বাবা বলতেন ফুটবলাররা হেড করে করে বুদ্ধিতে খাটো হয়ে যায়। কথাটা মোটেও ঠিক নয়। আমার পাতলা গোঁফরাশি যখন উঁকি দিতে শুরু করল, তখন একই গান বিরতিহীন বাজানোর হেতু পরিষ্কার হয়ে গেল।

আমাদের পাশে ফুটবলারের বাসা, তারপর এক চিলতে ছোটদের খেলার মাঠ পেরিয়ে প্রতিবেশী এক আপার বাসা। গানের হেতু সেই আপা। খুশির কথা এই যে সেই আপাকে বারান্দায় দাঁড় করানোর জন্য ফুটবলারকে মরতে হয়নি, মরণযাত্রা তো পরের কথা। তিনি বিকালেবেলা দোতলার বারান্দায় আসতেন, আমাদের ছোটদের বল খেলা দেখতেন সদা হাসিমুখে। উদ্দেশ্য বোধ হয় খেলা দেখা নয়, ক্ষণে ক্ষণে তার চোখ ফুটবলারের বাসার দিকে চলে যেত। যাই হোক, ফুটবলার তার মন জয় করে নদীতে ভালবাসার তরী ভাসালেন। ধন্যবাদ কিশোর কুমার! অবশেষে কয়েকটা বছর তারা স্রোতের অনুকূলে এবং প্রতিকূলে নৌকা চালিয়ে ঘাটে তরী বাঁধলেন। সেই বিয়েতে আমরা ছোটোরা কয়েকদিন ধরে কতই না আনন্দ করেছিলাম! তাদের অনেক বছরের ধৈর্য আর কষ্ট সার্থক হল।

আজকাল ছেলেমেয়েদের এত কাঠখড় পোড়াতে হয় না। যোগাযোগের অনেক আধুনিক পথ তৈরি হয়েছে। তারা দিনরাত একই স্বপ্নে বিভোরও থাকে না। ফুটবলারের মতো রাধাকৃষ্ণ কেচ্ছা করার সময় তাদের নেই, ধৈর্যও নেই। এদের সবকিছুই ফাস্টÑ তা ফুড হোক আর প্রেমই হোক, যেন ভি এইট টার্বো ইঞ্জিন ডাইরেক্ট ফিওএল ইনজেকশন। তাই তো ফেইসবুক স্ট্যাটাস ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তন হয়। সকালে ‘ইন রিলেশনশিপ’, রাত পার হতে না হতেই স্ট্যাটাস হয়ে যায় ‘ব্রেক আপ’।

আমি সেকেলে, গোঁড়া। নতুন কিছু গ্রহণ করতে পারি না বা ইতস্তত করি। যুগের পরিবর্তন হয়েছে, দেশের সংস্কৃতি নতুন আকার নিয়েছে, পাশ্চাত্যের প্রভাব পড়েছে। সাবাস গধৎশ তঁপশবৎনবৎম! ব্রিটিশ দুইশ বছরের উপনিবেশে বাংলার সংস্কৃতিতে যা করেছে, তুমি একা অল্প কদিনেই তার চেয়ে ঢের বেশি করেছ। জাহাজে করে তোমাকে সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ভারতবর্ষে আসতেও হয়নি। লাটসাহেবরা বেঁচে থাকলে মাথার চুল ছিঁড়তেন। যা হোক একটু আধুনিক হওয়ার চেষ্টা করি। মেনে নিই সব কিছু ফাস্ট। ছেলেমেয়েদের আধুনিক অনুভূতি মেনে নিলেও বিবেকবান মানুষ হয়ে সমাজের কিছু ভয়াবহ অবক্ষয় কী করে হজম করব তাই ভাবি।

দেশে অগণিত কিশোরী আর তরুণী প্রতারণার শিকার। এই তথ্য পুলিশ কিংবা সাংবাদিকদের কাছে পৌঁছে না। তবে মানসিক রোগের বিশেষজ্ঞদের দ্বারে দ্বারে ঘুরলে যে তথ্য পাবেন তা আঁতকে ওঠার মতো। এই অল্পবয়েসী মেয়েরা অনেকেই এত বড় ধাক্কা সামলে উঠতে পারে না। প্রচণ্ড মানসিক চাপে অনেকে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। অনেক অভিভাবক মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞর দ্বারস্থ হন, যদিও বেশিরভাগ অভিভাবক চেপে যান মান-সম্মানের ভয়ে। ফেসবুকপ্রেমীরা বলবেন এতে ফেসবুকের দোষ কোথায়? এত ব্যবহারকারীর দোষ। যুক্তিটা একেবারে ফেলে দেয়ার মতো নয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগের নাম করে এই কচি মাথাগুলোর মাথা ফেসবুক যখন চিবিয়ে খেয়ে মা-বাবার সঙ্গে একটা দূরত্ব তৈরি করে দেয় তখন ব্যবহারকারীকে আর দোষ দিতে পারি না।

তাদের বাবা-মায়ের প্রতি ভালবাসা আছে কম হোক আর বেশি হোক। অনেকে শুনেছি ফেইসবুকে মাকে নিয়ে কমেন্ট লিখেন, অনেকে এক আধলাইন কবিতা বা গানের কথাও লিখেন। সেই মা যখন দিনভর অপেক্ষা করে সন্তানের বাড়ি ফেরার পথপানে চেয়ে থাকেন, বাড়ি ফিরে তার মায়ের সঙ্গে বসে দুটো কথা বলার সময় হয় না। বন্ধু বা বান্ধবীর সঙ্গে আড্ডা যে শেষ হয়নি। তাই দুটো খাবার মুখে দিয়ে আবার সেই ফেইসবুক। অনেকে হয়ত ফাস্ট ফুড খেয়ে আসেন, মায়ের সযতেœ রান্না করা চিংড়ি বা কাঁচকি মাছের চর্চরি পেটে জায়গা পায় না। রাতভর চলে যোগাযোগ। সকালের ঘুম দুপুরে ভাঙে। মা আর সন্তানের ভালবাসার মাঝে যে বস্তু বসে দুজনকে দুদিকে ঠেলে দেয়, তাকে দানব ছাড়া আর কী বলতে পারি?

ভয় হয়। শঙ্কা হয়। কী করে আমাদের ছেলেমেয়েকে সুস্থ পরিবেশে বড় করতে পারব? বাবা-মা আর সন্তানের পারস্পরিক ভালবাসা সৃষ্টিকর্তার এক অপরিসীম অনুগ্রহ। এই অনুগ্রহকে যদি আমরা বাঁচিয়ে রাখতে পারি, কোনো বস্তু এই অনুগ্রহকে যদি গ্রাস করতে না পারে তবে ভয়ের কোনো কারণ নেই।





উনিশের ভাষা শহীদ ওরা ১১ জন স্মরণে- মোদের গরব মোদের আশা, আ-মরি বাংলাভাষা!

( 0 Votes )

প্রবাসী লেখকদের কলাম


11____SaKiL

ফারুক ওয়াহিদ, ম্যানচেস্টার, ক্যানেটিকাট থেকে : ১৯৬১-র ১৯ মে ভারতের আসাম রাজ্যের শিলচরের এগারো জন বাঙালি মায়ের ভাষা রক্ষার জন্য তথা মায়ের ভাষা বাংলায় কথা বলার জন্মগত অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন। ১৯৫২ সালে বাংলাদেশে অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব বাংলায় মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য যে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল এবং প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন সালাম, রফিক, সফিক, বরকত ও জব্বার। সেই ভাষা আন্দোলনের নয় বছর পরে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য এমন আরো একটি আন্দোলন হয়েছিল এবং সে আন্দোলেনে একজন মহিলাসহ এগারোজন বাঙালি বুকের রক্ত দিয়ে প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন আসামের বরাক উপত্যকার শিলচরে, সে কথা আমাদের অনেকের এখনো হয়তো অজানা রয়ে গেছে। পৃথিবীতে শুধু বাঙালিরাই তাদের প্রিয় মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে।

১৯৬১ সালে ভারতের আসাম প্রাদেশিক সরকার বরাক উপত্যকা (বরাক ভ্যালি)-র কাছাড় জেলার বাঙালি অধ্যুষিত শিলচর, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দির বাংলাভাষাভাষীদের প্রাণের ভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে শুধু অহমীয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র সরকারি ভাষা ঘোষণা দিলে বিক্ষোভে ফেলে পড়ে বাঙালিরা এবং পরে তা আন্দোলনে রূপ নেয়। একষট্টির ১৯ মে সকাল-সন্ধ্যা ধর্মঘটের সময় শিলচর রেলওয়ে স্টেশনে রেলপথ অবরোধের সময় আসাম রাইফেলসের একটি ব্যাটালিয়ন বাংলাভাষা আন্দোলনকারীদের প্রতি নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে এবং ১১জন ভাষাসৈনিক ঘটানাস্থলে শহীদ হন এবং আহত হন অর্ধশতাধিক। প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করেন শিলচর শহরে। রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায় শিলচর রেলওয়ে স্টেশন ও আশেপাশের এলাকা এবং শোকে স্তব্ধ ও হতবাক হয়ে যান বরাক উপত্যকার বাঙালিরা।

মায়ের ভাষা বাংলায় কথা বলার দাবী করতে গিয়ে এমন কী অপরাধ করেছিল বাঙালিরা! সমগ্র বরাক উপত্যকায় শোকের ছায়া নেমে আসে- প্রকৃতিতেও এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়- পাখির কলকাকলি স্তব্ধ হয়ে যায় এবং থেমে যায় খরস্রোতা বরাক নদীর স্রোতধারা। কাঁদো বাঙালি কাঁদো- ২০ মে শোকার্ত আন্দোলনকারীরা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে শহীদদের লাশ নিয়ে শিলচর শহরে স্মরণকালের বৃহত্তম শোকমিছিল বের করে। মায়ের ভাষা বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ১১ জন শহীদ হন, তারা হলেন- কমলা ভট্টাচার্য (পৃথিবীর এব মাত্র মহিলা ভাষা শহীদ), শচীন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর, কানাইলাল নিয়োগী, চন্ডিচরন সূত্রধর, সত্যেন্দ্র দেব, হীতেশ বিশ্বাস, কুমুদরঞ্জন দাস, তারিণী দেবনাথ, সুনীল সরকার এবং সুকুমার পুরকায়স্থ। আসাম রাজ্য সরকার আন্দোলনকারীদের চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হলেন বাংলাকে ২য় রাজ্যভাষা হিসেবে ঘোষণা দিতে।

বায়ান্নতে সালাম, রফিক, শফিক, বরকত, জব্বার সহ আরো অনেক নাম না জানা ভাষা শহীদের রক্তে রাঙানো অমর একুশে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর বিশ্ব ইতিহাসে এক নতুন মর্যাদায় আসীন হয়েছে। বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটি বাঙালির এ এক বিশাল অর্জন। বরাক উপত্যকায়ও ২১ ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ আনুষ্ঠানিকভাবে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে পালন করা হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় বাংলাদেশের কোথাও উনিশে মে বাংলা ভাষা শহীদ দিবস পালন করা হয় না এবং এই রক্তাক্ত ইতিহাস আজও বাংলাদেশে রহস্যজনকভাবে অনুচ্চারিত।

কিন্তু একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বরাক উপত্যকার বাঙালিরা সর্বাত্মক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে পাঠকদের উদ্দেশে এ সম্পর্কে একটু আলোকপাত করতে চাই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং হয়েছিল শিলচর-এর লোহারবন ট্রেনিং ক্যাম্পে।

আগরতলা থেকে ২৫/৩০টিরও বেশি বড়ধরনের শিখ ড্রাইভার চালিত ট্রাকবহরে করে শিলচর শহরের ভিতর দিয়ে যখন আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন শিলচরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল ছাত্র-ছাত্রী এবং স্থানীয় জনগন রাস্তায় নেমে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি ফুল ছিটিয়ে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিয়ে বরণ করে নিয়েছিল- শিলচর শহরে মনে হয়েছিল আনন্দের বন্যা বইছে- যেন অঘোষিত স্কুল-কলেজ সবকিছু ছুটি। শিলচরের রাস্তার দুই পাশের দোকান-পাট, অফিস-এর সাইনবোর্ড ছিল সব বাংলায় লেখা- রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম সৃষ্টি হওয়ায় জনগনের কথাবর্তা সব শুনতে পারছি- তারা বাংলাভাষায় কথা বলছে। ট্রাকের উপরে চড়ে অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখছি, আপ্লুত হচ্ছি আর অবাক হচ্ছি! এ কোন বঙ্গরাজ্যে এসে পড়লাম! এতো খাঁটি বাঙালি কোথা থেকে আসলো? করিমগঞ্জ- শিলচরে যে এতো বাঙালি বাস করে- এই প্রথম জানলাম।

শিলচরের বাঙালিরা যে বাংলাভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন- একথা তখন স্বপ্নেও শুনিনি- এ মহান প্রাণ উৎসর্গের কথা জেনেছি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার অনেক অনেক পরে। এখন খুব আফসোস লাগছে যেখানে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং হলো সে এলাকার জনগনের এ বীরত্বের কথা এতোদিন পড়ে কেন জানতে পারলাম! বাংলাভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করা বরাক উপত্যকার ১১ জন বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং মায়ের ভাষার প্রতি ভক্তি জানিয়ে গর্ব করে অতুল প্রসাদ-এর সাথে সুর মিলিয়ে বলবো-

“মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলাভাষা!

তোমার কোলে, তোমার বোলে কতই শান্তি ভালবাসা।”

http://youtu.be/nnvxO1rDC5c

-ফারুক ওয়াহিদ: প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা, ম্যানচেস্টার, ক্যানেটিকাট

 






নরমান্ডি ইনভেসন, জুন ৬,১৯৪৪ - তরুন বড়ুয়া

( 0 Votes )

প্রবাসী লেখকদের কলাম


তরুন বড়ুয়া : বস্টন থেকে :  ডি-ডে যোদ্ধাদের ওমাহা বীচে “রিট্রিট” বা পলায়ন করতে চাইলেও পেছনে যাবার কোন পথ ছিল  না আমেরিকান সৈন্যদের। শুধু ছিল মৃত্যু, সামনে জার্মানদের মেশিনগানের গুলি, আর পেছনে অতলান্ত সাগর জল; ডুবে মরা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না তাদেঁর।

এই সেই ওমাহা বীচ! মানুষ কেন যে যুদ্ধে লড়তে যায়? এই এক প্রশ্নটাকে অনেকাবার জানতে চেয়েছি, অনেক উত্তর বের করতে চেয়েছি। আমেরিকা আসবার কিছুদিন পর এক বৃদ্ধ নরমান্ডি যোদ্ধার সাথে আমার দেখা হয়েছিল। বেচেঁ যাওয়া সৈন্য, নাতি-পুতি নিয়ে বেড়াতে আসা। তারপর সেই ভয়াবহ নরমান্ডি যুদ্ধের যত কথা, যত অজানা তথ্য, বেঁচে যাবার সৌভাগ্য। আমিও সবে মাত্র ডি-ডে পড়লাম “বস্টন হেরাল্ডে”। তখনো পাবলিক লাইব্রেরি যাওয়া আসা তেমন হয়নি। আজ নামটাও মনে নেই,  লিখেও রেখেছিলাম। ছবি নেবার কোন উপায় ছিল না তখন। আজ কত না কাজে আসতো, আমার লেখায় একটা প্রাণ পেয়ে যেতো।

Tarun____SaKiL__2

প্যারিসের একটু উত্তরে আমরা দীপকের বাসায় উঠেছি, দীপক আমার অনুজ। কোথায় এলাম দীপকবাবু ? কেমন চেনা না মনে হয়, এখানে তো অনেক হেটেঁছি মনে হয়। সকাল সকাল বেড়োলাম কিন্তু কী ট্রাফিক ঢাকার চাইতে কম নয়। রুট-৪ নিয়ে “বুলোর্ভাট পেরিফেরিক’’ প্রকান্ড লড়ি-ট্রাক সামনে দাঁড়াতে আরো গেল বিশ মিনিট। সেইন নদির উপর দিয়ে সেতুটা পাড় হয়ে, দক্ষিণ পাড়ে গিয়ে হাইওয়ে এখানে বলে অটোরুট প্রথমে এ-১ এবং পরে এ-১৪ অটোরুট ধরে যেতে থাকলে একসময় ল্যা অটোরুট -১৩ নিয়ে “সেই ক্লু” তে চলে এসেছি। পশ্চিম দিকে যাচ্ছি। ভীষণ সুন্দর “সেই ক্লু ” সেইন নদী ঘেঁষে গড়ে উঠা শহর ওয়েদার এ্যডভাইজরি’-তে খুব একটা ভাল ছিল না, বৃষ্টি, ঠান্ডা, বাতাস ছিল তাই শত ইচ্ছে থাকা সত্বেও দীপক ছোট বাচ্চা নিয়ে রিক্স নেয় নি। সেইঁ ক্লু’ পার হতে না হতে, রোদ উঁকি দিতে আরম্ভ করল। এখান থেকে অনেক দূর ? ফাল্গুনী বলছিল এখানে কী, একটা খুব সমৃদ্ধ ইতিহাস থেকে থাকবে। বল্লাম আছেইতো। ১৭৯৯ সালে “ক্যু দ্যিইটেট্” ১৮ ব্রুমেয়ার ক্যু বলা হয়ে থাকে। নেপোলীয়ন বোনার্পাট ফরাসি ডিরেক্টরীকে বিতারিত করে ফ্রেঞ্চ কনস্যুলেটকে ক্ষমতায় বসান। এই এখানের সেইঁক্ল্যু রাজপ্রাসাদে এই বিদ্রোহ হয়।

তারপর ! আসতে থাকবে সাব-আর্ব, তারপর উত্তর, আবার পশ্চিম; এখন দুপাশে পাহাড় আর বন। সামনে এলো বাম পাশে “ভার্সাই ” যাবার রুট। বন অরণ্য ভরা এক্সপ্রেস ওয়ে শেষ করে এলাম।এখান থেকে শুরু হয়েছে। সমতল জলাভূমি, নি¤œাঞ্চল প্রকান্ড কৃষি মাঠ, মাঝে ছোট খাল গিয়ে মিশেছে ইংলিশ চ্যানেলে। দক্ষিণে আবার বন এবং পাহাড়।

ডি-ডে বীচে যাবার অনেকদিন থেকে আমার সঙ্কল্প।কিন্তু হয়ে উঠে নি, এত সহজ নয়। ব্যয় সাপেক্ষ, তার উপরে সময় এবং ছেলের পড়াশুনা, সব ছেড়ে বিদেশে যাওয়াটা একটা সঙ্গীন ব্যাপার। এবার হয়েছে, আর দেরী নয়; বল্লাম ওঠো আকাশযানে। তারপরে লেখতে হয়তো পারতাম না। কিন্তু সেদিন টিভিতে দেখছিলাম, কেনাটাকি ডারবী ২০১৩।

আরো কিছু ভুলার নয়। ১৯৯৪ তখন আমি বস্টনের ব্রাইটন শহরে একটা বেইসমেন্ট ভাড়া করে খুব সুখেই থাকছি। জীবনটা যেন বড় দীর্ঘ, সকালে উঠে এক কাপ কফি আর বস্টন হেরাল্ড অথবা বস্টন গ্লোব কিনে আনা, তারপর দুপুর পর্যন্ত সেই পত্রিকা শেষ না করে বার না হওয়া। কখন ছুটির দিন আসবে, ইন্ডিয়ান স্টোর থেকে ছয়টা ম্যুভি নিয়ে সাড়া রাত দেখা হলে, সকালে ছেলে স্কুলে দিয়ে নিদ্রাহীন ঘুম দেওয়া।সে এক অনিবার্য ভেগাবন্ড ফেমিলি লাইফ। আছি ফেমিলি নিয়ে, কিন্তু কোন গোল নেই; জীবনের কোন গতি নেই। আছে আমেরিকান মর্ডান ট্রাজিক এ্যাভরিডে লাইফ।

Tarun____SaKiL__1

কোনদিন খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে বের হলাম, তার পর দু’টো কাজ। রাতে যখন ফিরেছি, রাস্তায় কেহ নেই। বাসায় মা ছেলে অঘোরে ঘুম।কার কি চাহিদা জানবার অবসরটুকু নেই, শুধু ছিল আমি ফিরে যেতে পারি না।আমি আবার কলেজে মেকি সম্মান নিয়ে অধ্যাপনা করার কথা ভাবতেই গাটা কেমন হিম শিতল হয়ে যায়।তারপর যদি সেই “ ইন্টোরমিডিয়ারী” বিদেশী কোম্পানী? সেদ্ধ করে যেন শ্রম নিয়ে নেয়। হতাশা আমার কোনদিন ছিল না , কিন্তু বাস্তবতা যে ভ’ল নয়। ভাল ছাত্র যে ছিলাম না তাও নয়, কিন্তু ফল যে ভাল ছিল তাও মিথ্যে। জীবনটাতো পুরোটাই পরীক্ষা। নয়তো বা পরীক্ষার খাতায় না করলাম। কিন্তু ? কিন্তু, কিন্তু থেকে যায়। যার একবার যায়। সে শুধু, আশায় আর হতাশায় থাকে। ভাগ্যিস আমি টেনিসন পড়েছিলাম। কিন্তু একটা আমার ভুল ছিল। মাথায় এত চুল আছে কিসের আবার যতœ, বুড়ো হবার অনেকতো বছর পরে আছে সামনে। বদঅভ্যেস না থাকাটও মানায় না। গরীব দেশের লোক যদি একটু সৌখিন না হয়, তখন তাদেরকে মানায় কম। সব কিছু মিলে হাড়ি আনতে পান্তা ভাত!!  আমেরিকায় বলে “ পে চেক্ টু পে চেক্”। মন্দ নয়।

ছটির দিনে সাড়া রাত জেগে ম্যুভি দেখা, বিয়ার আর সিগারেট কি একটা অদ্ভুত আনন্দ। কিন্তু কোন গোল নেই  যেন ডেড্ এন্ড-এ ঠেকেছি। আমি আগেও বলেছি, আমার লেখায় প্রসঙ্গ ছেড়ে যাই; আমি ডুব দিয়ে জীবনের সত্যতাকে খুঁজতে চেষ্টা করি, সত্যতাকে অন্যদের কাছে পেশ করার প্রত্যাশায় থাকি। এমন একটা দিনে আমার চোখে পড়ল। সত্যি বলতে কি, আমি কোন ইতিহাস পড়িনি, যাও পড়েছি ছোটখাট হিস্ট্রি অব ইংলিস লিটারেচার। চোখে পড়ল বস্টন গ্লোবে, ১৯৯৪ “দ্যি ফিফটিয়্যেথ্ এনিভাসেরী অব ইনভেসন অব নরমান্ডি ”। এত কথা বলার পেছেনে এই আমার রেশনাল। সেই দিন খুব মনযোগ দিয়ে পড়েছিলাম। তখন ভিডিও ক্যাসেটের রমরমা ব্যবসা। কাছেই “ভিডিও স্মিথ”-এ গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের কাছে  কি ওর্য়াল্ড ওয়ার টু কোন ম্যুভি আছে ? তখন ভিডিও ব্যবসাতে খুব অভিজ্ঞ মানুষ থাকতো, একেবারে লাইব্রেরি স্টাইলে বলে দিতে পারতো। সার্ভিস কাকে বলে? কারণ, এখানে থেকেই আপনার আরম্ভ হয় আনন্দের অভিজ্ঞতা। লম্বা চুল ওয়েল ড্রেস্ড, নেইম টেগ দেখে বুঝে নিলাম, নাম তার রাইয়ান। নাম ধরে ধরে ডাকলে, এখানে মানুষ খুব খুশি হয়। হাতেই ছিল দিনে পত্রিকা আমি ফ্রাঞ্চ তথা যে যুদ্ধের মাধ্যমে মুক্ত হয় আজ জুন ৬, ১৯৯৪।

আর বেশী বলতে হলো না, ও! মাই ফ্রেন্ড;“প্লিজ ডু কাম উইথ মি। নরমান্ডি ইনভেসন, “আই উইল গিভ ইউ এ বিউটিফুল মাস্টারপিচ ম্যুভি, আর উই অফ টুমরো, ইয়েস। প্লিজ ওয়াচ কেয়ারফুলি এন্ড এনজয়। ডোন্ট ফরগেট লেট মি নো?” হাতে তুলে দিলেন “দি লংগেস্ট ডে ” ১৯৬২ সালে কাস্ট, ১৯৫৯ কর্নেলিয়াস রাইয়ানের লেখা ঐতিহাসিক স্টোরি। কিন্তু পৃথিবীর যত বিখ্যাত কিংবদন্তি অভিনেতারা অভিনয় করেছিলেন এই ছবিটাতে।

Tarun____SaKiL__4

এই বিখ্যাত ম্যুভিটাতে অভিনয়ে ছিলেন হলিউড বিখ্যাত রির্চাড বার্টন, হেনরী ফন্ডা, রর্বাট রাইয়ান, জন ওয়েইন, রর্বাট মিচাম্, জেম্স বন্ড সন কনেরী, রির্চাড টড্, কেনেথ্ মোর। দীপক বল্লো দাদা, আপনার মনে এত থাকে কি ভাবে ? দেখ! দীপক এটা “প্যাশনন্স” আমার, এই যে ধরো তোমার সাথে নরমান্ডি যাবার ‘ডিরেকসন্’ে সহয়তা করতে পারছি। এটা হলো মন থেকে আগ্রহ, ভীতি নেই, সংশয় নেই যাচ্ছি আর দশ জনের মত সত্যতা পরখ করতে । পিলগ্রিমেজে গেলে একটা ভয় কাজ করে, সেটা কী ? আছে, ভায়া । বড় হয়েছি, বুদ্ধি হয়েছে পর্যন্ত যা দেখেছি এবং কিছু যা করেছি “হেল, নরক” বা দোজখে যাবার জন্যে যথেষ্ট ।এত পাপ আমার নিয়ে কেন পিলগ্রেমেজে যাই ? তাই ভাবলাম, আর দশ বন্ধু যারা আমার পূর্বে, পশ্চিমে গিয়ে ‘পিলগ্রিমেইজ’ করে আসলেন।

তারপর। কত না সত্য বাক্য দিয়ে ভরিয়ে দেন, সভা সমিতি । কিন্তু আমি বোকা সোকা মানুষ, আমার ভুল,আমার লোভ-লালসা আছে সেটা অস্বীকার করতে পারি না ।তাই ভয়ে আমি এখনো গেলাম না ‘পিলগ্রিমেইজে’ । ছাত্র জীবনে পড়তে হয়েছিল, দীপক ! “ পিলগ্রিম প্রোগ্রেস” । চসায়ার। ইংরেজীতে, চয়স্যার । দাদা, এত কথা কিভাবে মনে রাখতে পারেন? আপনি । দাদা আপনার কথায় একটা ঝাকুনি আছে । দীপক, তুমি আমাকে বেশ ভাল কথা মনে করালে । কী দাদা । ফাল্গুনী, বলে উঠলো । শুনবেন না তো ! ও, বেড়াতে গেলে একটু বেশী, “এক্সাইটেড্” হয়ে পড়ে । আমি অভ্যস্ত হয়ে গ্যাছি , আমার তেমন আর লাগে না । আমি বল্লাম, ঠিক ঢাকাই স্ট্যাইলে, কেন গো ! সবে মাত্র বুদ্ধদেব বসুর প্রবন্ধ সমগ্র পড়ে এলাম । তিনি ইংরেজী উপন্যাসের কথা বলতে গিয়ে , বলেছেন ।

একশত পৃষ্টা পড়তে গেলে লগি বইঠা ঠেলতে হয় । আর দীপক তুমি যে বল্লে , একটা ঝাকুনী আছে। বুদ্ধদেব বসু বলেছেন , ফরাসী উপন্যাস এমন একটা ঝাকুনী দিয়ে আরম্ভ হয় যে প্রথম লাইন পড়লেই আরো পড়তে ইচ্ছা করে । কেইনের সাইন দেখা গেল , টোলও আসলো। দীপকের একটু বাড়াবাড়ি আথিয়তা আছে । টোল সে আমাকে কোন মতে দিতে দেবে না । ফরাসীদের ‘হসপিটালিতে’ কোন আপোস নেই । এই অভ্যেস কোথায় শিখে নিল,এটা দীপক নয় । তবে কে ? তার সুন্দরী স্ত্রী , আবার বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী ছিল । ‘আফটার অল’শ্রদ্ধা আছে । বেলেন্ডেট একাট সুরসুরি দেওয়া , ম্যাচিওরড্ বাঙলা এবং ফরাসী মিশ্রিত আবেদন আমাকে ইর্ষান্বিত করে যাচ্ছে । এজন্যে আমি পিল্িরগমেইজে যেতে পারি না । ম্যাকিয়াভেলী কষ্ট আর দৈন্যতায় মারা গেলেন, আমি শতভাগ হলপ করে বলতে পারি । তিনি বেশ আছেন কিন্তু স্বর্গে নয় । তাঁর ইচ্ছা তাঁর ইশ্বর পূরন করেছিলেন । আািম এগুলো বলে কিচু প্রকাশ করছি আবার সাবকন্সাস্ মাইন্ডে অন্য কিছু , ঝাকুনি দিয়ে ফরাসী সাহিত্য আরম্ভ হয় আর বাঙালী নারী ? সে এক অপূর্ব , ঝাঝ্ আর ঝাকুনি দু টো দিয়ে আরম্ভ করতে চায় । কিন্তু , বেশী দূর এগুবার আগে সামাজিক প্রশ্নবিদ্ধ হয় । যা কাটিয়ে যে না উঠেছে, তা নয় ।

Tarun____SaKiL__3


আজকে যখন মে ০৮, ২০১৩ সামারভিল পাবলিক লাইব্রেরীতে ‘ডি-ডে ইনভেসন’-এর উপর বই আনতে গেলাম, প্রথমে কর্নেলিয়াসের বইটাই হাতে আসে। কি এক অদ্ভুদ যোগাযোগ, যার কাছ হতে ম্যুভি নিয়েছি তাঁর নামো ছিল রাইযান। তখনো সেইভিং প্রাইভেট রাইয়ান ম্যুভিটি বের হয়নি। তবে সেদিন ১৯৯৪ সালে ৬ জুন মাসের এবং বস্টন হেরাল্ডে ‘ডিটেইল’ প্রকাশ হয়েছিল প্রাইভেট র্য়াানের বীরত্বভরা অভিযানের ইতিহাস। বিকট মর্টারের গোলায় তার শ্রবণশক্তি নষ্ট হয়ে যায়। যার ফলে রাইয়ান পেছনে রিট্রিটের অর্ডার শুনতে পায়নি এবং জার্মান সৈন্যদের উপর আক্রমণ করে দখলে নিয়ে আসে ওয়ার ফিল্ড। এই ছিল সেদিনের স্টোরি কিন্তু স্টোরি বল্লে, একটু হালকত মনে হয়। তাই আমি বলে ছি। জলন্ত ইতিহাস। যাহোক, ভিডিও স্মিথের রাইয়ানকে আজ যদি পেতাম, কত কিছু বলতে পারতাম। কিন্তু সে ব্যবসা আর বেঁচে নেই। দেউলিয়া হয়ে গেছে। আমেরিকায় অন লাইন ব্যবসার সাথে সাথে অনেক লোকের চাকরি গিয়েছে, ব্যবসা হারিয়ে গেছে; এমন কি পার্সোনাল সার্ভিস যে একটা কথা আছে তাও হয়তো, আর থাকবে না ? এ- আমার অভ্যেস, কেহ আবার বলতে চান, আমার লেখার স্টাইল। তাঁরা আবার পছন্দ করেন কিনা না জানি না, তবে উৎসাহ দিয়ে বলেন তরুন লিখে যাও না কেন? আািম আমার ভুল নিয়ে আবার ডুবে যাই। লেখায় ব্যস্ত হয়ে যাই  প্রতীক্ষা নিয়ে, সম্ভাবনার দিনগুলোর জন্যে।

কর্নিলিয়াস রাইয়ানের ‘ দি লংগেস্ট ডে’ এই ম্যুভি না দেখেছেন এমন কেহ আজ আর নেই পৃথিবীতে, বলতে হয় যদি না দেখে থাকেন তাহলে ; তাদের জন্যে করুণা হয়। এখনো তাঁরা  কত তমসায়, অমাবস্যায় নিমজ্জিত হয়ে অভিজ্ঞানের আশায় আছেন। এত বড় একটা মাস্টারপিস ম্যুভি কি করে সৃষ্টি হয়েছিল। আমার মনে হয়েছে হয়তো প্রকৃতি তাদেঁর সৃষ্টি করেছিল শুধু এই মুভিটার জন্যে। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে এক অপরের সাথে যদি সমাজ নির্মাণ করতে চাই, তাহলে এই যুদ্ধ, এ্ই আক্রমণ দেখার দরকার আছে। যদি মুক্ত হয়ে বিহঙ্গের মত থাকতে চাই, থাহলে এই মহা প্রকান্ড ছবিটির অভিনেতা, অভিনয় এবং আধুনিক চিত্রকৌশল; সাহিত্য-ইতিহাসের এক সাথে যোগদানের দরকার আছে মানব সভ্যতার জন্যে!! এত বছর পরে আমি তাও, আসতে পেরেছি। স্বাধীনতার, মুক্তির জন্যে,ইউরোপ মুক্তির  রণাঙ্গনে। জীবনকে উপলব্ধি আমি করেছি, আমার মনে হয়েছে; আমি এখানে যুদ্ধ করেছিলাম, গ্লাইডার থেকে ছত্রীসেনা হয়ে মুক্তির কামনায় যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলাম। আমি বলে যাচ্চি তো যাচ্চি। কত বার একা বেড়িয়েছি,  ফাল্গুনী বল্লো তোমার হলোটা কী? কেন জান মিঃ সেন্ডলার বস্টনের “বেক্ বে” কমিউিনিটির একজন বড়মাপের ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশে হলে নেতা বলতাম। নিউবেরী স্ট্রিটে কিংবা বয়েলস্টোনে হাঁটলে অনেক বিল্ডিংয়ে তাঁর কোম্পানীর নাম সোনালী অক্ষরে কালো সাইনে দেখতে পাবেন। এই মি: সেন্ডলার আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন, নরমান্ডি লেন্ডিং ডি-ডে বীচ ঘুরে আসার জন্যে। আজ তাঁর সাথে দেখা হয়ে গেলো তিনি যাচ্ছিলেন অফিসের কাজে, আর আমি ? দাঁড়িয়ে ছিলাম দায়িত্বেও ভারে। এ শুভক্ষণ। এই এক সুবিধা, এই দেশ আমেরিকায়। যত বড় লোক হন, বেশ বড় করে নাম ধরে ডাকলে খুশি হয়ে এগিয়ে আসেন। আর আমাদের দেশে? জুতা খুলে গালে না মারবে ! মিঃ সেন্ডলার বল্লেন, ইট ইজ ভেরী পাওয়ারফুল ! আই সো গ্লেড দ্যেট ইউ হেপেন্ড ট্যু গো এন্ড সী ন্যরমান্ডি ! আই এম প্রাউড অফ ই্উ। তরুন। তার পর তিনি হেঁটে চলে গেলেন তাঁর অফিসে। এই হলো শক্তি।

হ্যাঁ তাইতো। বেশ দেরী হয়নি। সামারভীল পাবলিক লাইব্রেরী হ’তে বই এনেছি। এ সুযোগ ছাড়বার নয়। কাল হয়তো ভিকিরী হবো, আগামীকাল হয়তো পথে হাঁটবো। ঠিক বৃটিশ সা¤্রাজ্য যখন ভারত হারায়, তাদের আর কোন শক্তি থাকেনি; না অর্থে, বা বিজ্ঞানে। তাই এত অভিজ্ঞান, রাজনীতি। যাহোক, এই একটা পরম সৌভাগ্য বলছি আমি, যা পড়তে চাই ; যদি না থাকে লাইব্রেরী অন্য লাইব্রেরী এমনকি অন্য স্টেইট থেকে ধার করে আনবে এবং আপনাকে টেলিফোন করে  বলবেন, আমি খুব দুঃখিত। আমাদের লাইব্রেরিতে আপনার আগ্রহের বই ছিল না। কিন্তু আমরা কর্তৃপক্ষ কিছুতেই আপনার পড়ার ইচ্ছাকে, আপনার অভিসন্ধিৎস্যু অভিলাষকে কিছুতেই আমরা খাট করে দেখতে পারি না। তাই এই বইটি নিয়ে পড়বেন কী মিঃ বড়–য়া। আপনি আমাদের দীর্ঘ দিনের পাঠক বন্ধু। আমি অবাক হলাম, অবাক হওয়া ছাড়া আমার উপায় ছিল না। দুই দশকের বেশী  পরে এসে; এরকম একটা অপ্রস্তুত অবস্থায় থ্কাতে হবে? ভাবতেই পারিনি। পাঠভ্যাস কিছুতেই যাতে ভাটা না পরে, এই হচ্ছে লাইব্রেরির কর্মকর্তাদের প্রচেষ্টা আর জ্ঞান চর্চা করবার উৎসাহ প্রদান করা। আমি লাইব্রেরি সাইন্স জানি না। জানলে আরো সম্যকভাবে প্রকাশ করতে পারতাম। কিছুতো বাড়তি কথা বলতে হয়, আমার লেখা তো আর গবেষণা বা রির্পোট নয়। আমার ফ্রিলেন্সর স্বাধীনতা আছে। না হয়, কিছু ব্যর্থতার কথা কিছু বলে যাই। বেশ তো !

Tarun____SaKiL__5

আবার ফিরে যাই, “দ্যি লংগেস্ট ডে” ম্যূভিটার স্টোরি আমি বলছি আর দিপক গাড়ি চালাচ্ছে। এখনো অটোরুট এ-১৩ আছে অনেক টোল পরে পথে। “কায়েন” এর সাইন আসল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কয়েক দশক লেগেছে, এই শহরকে নতুন রূপ দিতে। অনুপম সুন্দর একটা আধুনিক শহর আবার পুরনো ভাষাকে এবং শিল্প-শৈলিকে শ্রদ্ধার সাথে অক্ষুন্ন রেখেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ‘এ্যলাইড’ র্ফোস এত বোমা বর্ষণ করেছিল জার্মান থেকে মুক্ত করার জন্যে, বলতে গেলে ‘কায়েন-এ কিছুই ছিল না। সব ধ্বংস হয়ে যায়।

দীপক! প্রথমে ‘আরমানচেস্’ এর দিকে যাই, আপনি কী বলেন। আপনি হলেন ক্যাপ্টেন। বস্। আমরা ‘অৎৎড়সধহপযবং” এর দিকেই ড্রাইভ করছি। দীপকবাবু আমাকে বলছেন বহুবার। দাদা , আপনি আমাকে দীপক বলে সম্বোধন করলে আপনার কী কোন অসুবিধা হয়। মোটেও নয়। হ্যাঁ, দাদা! ভাই আমার। আমি তোমার অনেক বড়, পাশাপাশি গ্রাম আমাদের। কী কাব্যিক নাম তোমাদের গ্রামের নাম। বিনাজুরী। মনে হয় এ যেন বিভূতী পড়ছি। কিছুটা বর্তমানে বুদ্ধদেব গুহ , হুমায়ুন আহমেদ বলেছি, এই শক্তিমান সাহিত্যিক আজ আমাদেরকে বই পাঠের সন্ধান দিয়েছেন, অনুসন্ধিত্বসার অটোরুট নির্মাণ করেছেন।  বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম যে কিভাবে বই কেনায় ঝুকে পড়েছে, এটা বই মেলায় গেলে বোঝা যায়। প্যারিস থেকে গেল দিন ঢাকায় নেমেছি। ২১ তারিখে বই মেলায় অর্থ্যাৎ ২০১৩ সালের বই মেলায়, সালের কথা বলার পেছনে কারণ আছে। ওগুলো পরে কখনো প্রসঙ্গ আসলে বলা হবে। বাংলা একাডেমী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই খোলা অংশটাতে মানুষ কী সূঁচ যেন ঢুকতে পারবে না। ফাল্গুনী বলল, এ কী লেখছ? ছিলে ‘কায়েন’- নরমান্ডিতে হুট করে চলে এলে, “বই মেলায়”। কেন? যান। পালিতে একটা কথা আছে,
“ মন চ্ছেট্টা মন মায়া”। মানে, ২০১০ সালে এই বই মেলায় আমার ’ফ্লোরেন্সের পথে’ বইটি প্রকাশিত হয়েছে। আমার যত দিনের অধ্যয়ন, অভিজ্ঞতা আর শত শত মাইলের অক্লান্ত শ্রম, এগুলোর শৈল্পিক নির্ঝাসটুকু যদি কিছুটা প্রকাশ পায়। এভাবে সকল লেখক নিজেদের অবস্থান থেকে তাদেঁর বক্তব্য, দৃষ্টি, চিন্তার বা¯তবে আসার স্থান এই বই মেলা !!


দুই
তোমার লেখাটা পড়লাম,এখানেও তুমি ডিজ্ অর্গানাইজড্ । তুমি লিখতে যাচ্ছ, নর্মান্ডি ইনভ্যেশন নিয়ে ; লিখে গেলে  ম্যুভির কথা, আসার কথা । আসলাম কই? এটি মাত্র “অপারেশন ওভারর্লডে’-এর মত প্রস্তুতি ।ঐ যে বলেছিলাম, “কেনটাকি ডার্বি হর্স নরমান্ডি ইনভেসন’ । টিভিতে দেখতে পেলাম, আমেরিকার মানুষ কি একটা স্পিরিট নিয়ে দেখেন । এবারে চারজন ‘ওর্য়াল্ড ওয়ার টু ’ ভেটারন খুজে পান ২০১৩ সালে , যারাঁ এই নরমান্ডি ইনভেস্যনে ৬ জুন, ১৯৪৪ সালে ফরাসীতে যুদ্ধ করেছিলেন । বিল উইল্চ, রে উডস্ , জে জে হুইটমেয়ার এবং এল্যান রিভস্ । এদেরকে চার্চিল ডাউনসে নিয়ে রেইসের ঘোড়া এবং হর্সম্যানের সামনে নিয়ে সন্মান করা হলো, বীরদের বীরত্বের মহিমা নিয়ে হর্সম্যান দৌড়বেন ডার্বি হর্স র্নমান্ডি ইনভেস্যন । আমিও তাদেঁরকে স্মরন করে লিখে যাই । (চলবে )






বিদেশে বাঙালি প্রজন্ম

( 0 Votes )

প্রবাসী লেখকদের কলাম



প্রবীর পাল : সুইডেন থেকে : প্রবাসে বাঙালির পা অনেক যুগ আগেই পড়েছে। ১৯৭১ সালের আগে ব্রেইন ড্রেইনের আশীর্বাদে ইউরোপ আমেরিকায় মেধাবীরাই সাধারণত যেত। তবে বৃহত্তর সিলেটবাসীদের শ্রমিক হিসেবে বিলেতে পা পড়েছে ১৯৪৭ সালের আগেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে সার্বিকভাবে বাঙালি ছিল ঘরকুনো। উচ্চ শিক্ষার্থে প্রবাস যাওয়া ছাড়া তেমন কাউকে পাওয়া যেত না যিনি কর্মজীবী হিসেবে প্রবাসে গিয়েছেন।


১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাঙালিদের চলাচলের পরিধিতে দেশের বেষ্টনী ছিঁড়ে দিয়েছে। আমরা প্রবাসমুখী হয়েছি। প্রধানত রুটিরুজির আশাতেই। শুরু হয় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মজীবী হিসেবে যাওয়া।


মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেখল সোনার খনির খোঁজ। যারাই যাচ্ছে তারাই রাতারাতি কিছু পয়সার মুখ দেখছে। দেশে চোখে লাগার মতো স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মালিক হয়ে যাচ্ছে রাতারাতি। শুরু হলো দেশের ট্রাভেল এজেন্টদের রমরমা ব্যবসা।


শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা তখন হু হু করে বাড়ছে। বাঙালির প্রবাসে যাওয়ার ইচ্ছাও প্রবল থেকে প্রবলতর হতে থাকল দেশের অনিশ্চিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে। তখন সাধারণ বাঙালির দেশ ছাড়ার আকাঙ্ক্ষা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকল না। শ্রমজীবী হিসেবে সিঙ্গাপুর, কোরিয়া আর জাপানে যাওয়ার তোড়জোরও দেখা গেল।
এর ফাঁকে ফাঁকেই কিছু বাঙালি যাদের নিকটাত্মীয় বা বন্ধুবান্ধব ইউরোপ, আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে ছিল তাদের হাত ধরে সেখানে পাড়ি দেওয়া শুরু করল ট্যুরিস্ট ভিসায় অথবা বিনা ভিসায় বিভিন্ন পথে। তাদের মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ল এ মহাদেশগুলোর গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে মানুষ রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে অনাদিকাল থাকতে পারেন। এর পরই শুরু হলো ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন দেশে বাঙালির রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার।


ধীরে ধীরে এভাবেই বাড়তে থাকল ইউরোপ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে বাঙালির বসতি স্থাপন। অনেকেই প্রবাসী নামের ইতি টেনে অবস্থানরত দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে সে দেশের স্বাভাবিক স্রোতে মিশে গেছেন। অবশ্য এই নাগরিকত্ব গ্রহণের সঙ্গে প্রতিটি বাঙালি পরিবারের প্রবাসে জন্ম নেওয়া ও বড় হতে থাকা দ্বিতীয় প্রজন্মের কৃষ্টি ও মননশীলতাগত ব্যবধানের পরিবর্তিত অবস্থাও কাজ করেছে অনেকাংশে।


আজ ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের বিভিন্ন দেশে দ্বিতীয় প্রজন্মের বাঙালির সংখ্যা কম নয়। অনেকেই এ দেশগুলোতে সুপ্রতিষ্ঠিত। কেউ পড়াশোনা করে নিজের কেরিয়ার গড়েছেন আর কেউ ব্যবসা করে। তবে বেশির ভাগ লোকজনই কায়িক পরিশ্রমের পেশায় নিযুক্ত। দ্বিতীয় প্রজন্মের দূরবাসী বাঙালিরা বৃহদাংশই পড়াশোনা করে আজ নিজের কেরিয়ার গড়ে তোলাতে ব্যস্ত। অনেকে এর মধ্যেই অনেক দূর এগিয়েও গেছেন কেরিয়ারের দৌড়ে। তবে প্রজন্মের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এদের বাঙালি পরিচয়ও ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হবে এটাই স্বাভাবিক।


প্রবীর পাল
উপছলা, সুইডেন

জার্মানিতে বাঙালির গৌরব ও লজ্জা

( 0 Votes )

প্রবাসী লেখকদের কলাম


সরাফ আহমেদ : জার্মান থেকে : হলভর্তি লোকজনের সামনে বাংলাদেশের গৌরবগাথার কথা বলছেন তিনি। জার্মান পার্লামেন্টের উন্নয়নবিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি ইয়ুরগুন ক্লেমকে এমপি বলছেন তাঁর বাংলাদেশ সফরের অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির কথা, ‘ধরুন, আমাদের দক্ষিণ জার্মানের বাভেরিয়া আর বাডেন ভুটেনবার্গের আয়তনের সমান আয়তনের বাংলাদেশে প্রায় ১৬ কোটি লোকের বাস আর আমাদের এই দুটি প্রদেশে বাস করে মাত্র ২৩ লাখ মানুষ। অথচ ওই ছোট এক ভূখণ্ডে ১৬ কোটি লোকের খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে; রাস্তাঘাট, পরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসাব্যবস্থা সবই চলছে। রয়েছে অভিজ্ঞ সুশীল সমাজ এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত এনজিও নেটওয়ার্ক আর অনেক নারীকর্মী।’ জার্মান সরকারের এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলবিষয়ক রাজনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের প্রধান ক্রিশ্চিয়ান ভাগনার বললেন, তাঁদের গবেষণায় উঠে আসছে যে আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় সামাজিক ও অর্থনীতিক উন্নয়নে আগুয়ান শক্তি হিসেবে দেখা যাবে। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে জার্মানিতে থাকি, বাংলাদেশকে নিয়ে জার্মানিতে এমন উচ্ছ্বসিত কথাবার্তা শুনিনি।


শুনতে শুনতে অজান্তেই চোখে পানি চলে আসে। ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে বার্লিন শহরের কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলের উন্নয়নবিষয়ক সংগঠন কনরাড আডেন আওয়ার ফাউন্ডেশন আয়োজিত তাদের সদর দপ্তরের সেই সেমিনারে আলোচনার বিষয় ছিল বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার পরিবেশ ও জ্বালানির নিরাপত্তা। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনিও উপস্থিত ছিলেন, আরও উপস্থিত ছিলেন সাবেক জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফলকার রুয়ে, পার্লামেন্টের কয়েকজন সদস্য, আমলা, জার্মানির দক্ষিণ এশীয় বিশেষজ্ঞরা এবং আমরা কিছু বাঙালি।


এর মধ্যে খবর পেলাম জার্মান পার্লামেন্টের দক্ষিণ এশিয়া উন্নয়নবিষয়ক সংসদীয় কমিটির আট সদস্য এ বছরেরই মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে জার্মান অনুদানে পরিচালিত প্রকল্পগুলো দেখতে বাংলাদেশ যাবেন। একই কাজে তাঁরা প্রতিবেশী দেশ ভুটান সফর করবেন। আর যাওয়ার আগে তাঁরা জার্মানিতে বাংলাদেশ বিষয় নিয়ে যাঁরা কাজকর্ম করেন তাঁদের সঙ্গে বার্লিনে পার্লামেন্ট ভবনে কথা বলবেন। আলোচনায় প্রথমেই শাহবাগ আন্দোলন প্রসঙ্গ, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি, বাংলাদেশজুড়ে জামায়াতের সহিংসতা, বৌদ্ধ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা-ভাঙচুর, আগামী নির্বাচন—এসব প্রসঙ্গ আসে। সবশেষ ড. ক্লেমকে জানান, বলতে খারাপ লাগলেও তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এবার তাঁরা বাংলাদেশ যাবেন না, শুধু ভুটান সফর করেই ফিরে আসবেন। নানা সূত্রে তাঁদের কাছে বাংলাদেশে নিরাপত্তাহীনতার খবর আছে। মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়।


কদিন আগে একটি সেমিনারে আবার দেখা হয় জার্মানির দক্ষিণ এশীয় বিজ্ঞান ও রাজনীতিবিষয়ক গবেষণা ফাউন্ডেশনের দক্ষিণ এশীয় বিভাগের পরিচালক ক্রিশ্চিয়ান ভাগনারের সঙ্গে। দীর্ঘদিন বাংলাদেশ নিয়ে কাজ করছেন। সাম্প্রতিক সহিংসতা ও হরতাল আর নির্বাচন নিয়ে তাঁর চেহারায় দেখি হতাশার ছায়া। বললেন, ‘বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে জার্মানিসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো বড় অঙ্কের তহবিল জোগাচ্ছে, তাই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আমাদের কাম্য।’ উল্লেখ্য, এই ফাউন্ডেশনই জার্মান সরকারকে বিভিন্ন দেশের নানা ঘটনার গবেষণা প্রতিবেদন দিয়ে থাকে।


এরপর এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহান্তে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বৈদেশিক ও নিরাপত্তানীতি-বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্যাথেরিনা অ্যাসটন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন। সেখানে তিনি ধর্মীয় মৌলবাদীদের সহিংসতায় সবচেয়ে বেশি হামলার শিকার গোষ্ঠীগুলো, বিশেষ করে হিন্দু জনগোষ্ঠীকে, রক্ষায় সহিংসতা রোধ এবং আরেকটি গ্রহণযোগ্য সংসদ নির্বাচনের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশের প্রধান দলগুলোকে আলোচনায় বসার তাগিদ দেন।


দেশজুড়ে হেফাজতিদের সহিংস আন্দোলন ও তাদের ১৩ দফা প্রশ্নে ঢাকায় নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত আইনবিদ আলব্রেখট কনজে ঢাকায় প্রকাশ্য একটি সভায় বলেছেন, হেফাজতে ইসলামের দাবি-দাওয়াগুলো বাংলাদেশের সেক্যুলার ঐতিহ্যের সঙ্গে মোটেও মেলে না; তা ছাড়া বাংলাদেশ ইরানের মতো ইসলামিক প্রজাতন্ত্র নয়, এটি একটি গণপ্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র।
আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু বের্নহাড হার্টলাইন বহুবার বাংলাদেশে গেছেন। এর মধ্যে একদিন বললেন, বহুবার বাংলাদেশ সফরের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, বাংলাদেশে পরিবহনের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বাস-ট্রেন নেই অথচ প্রায় প্রতিদিন বাস-ট্রাক পুড়ছে; রাজশাহী, ঢাকা, চট্টগ্রামে ট্রেনে আগুন দেওয়া হয়েছে, এসব কারা করছে? আমি চুপ করে থাকি। কারা এসব পোড়াচ্ছে বা আমার দেশের সমস্যা, আমার থেকে আমার জার্মান বন্ধুবরের বেশি জানার কথা নয়।


ভিনদেশি আলব্রেখট কনজে, ক্যাথেরিনা অ্যাসটন, ক্রিশ্চিয়ান ভাগনার বা বের্নহাড হার্টলাইন বাংলাদেশের যে সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য বা গণতন্ত্র ও সহিংসতার কথা বললেন, তা ক্ষমতার মোহে বা ক্ষমতার লোভে আমাদের অনেক রাজনীতিক বোঝেন না বা না বোঝার ভান করছেন। কিন্তু বাংলাদেশে না জন্মেও ভিনদেশিরা বাংলাদেশের আত্মা আর জনগণের কথা বলছেন।
সবশেষে গত ২৪ এপ্রিল সাভার ট্র্যাজেডি, বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাধীনতাযুদ্ধের পর এক দিনে হাজারের ওপর মানুষের মৃত্যুর ঘটনা বিরল। সেদিন থেকেই ইউরোপের সব পত্রিকা আর টেলিভিশনে সংবাদ শিরোনামে চলে আসে বাংলাদেশ। প্রতিবেশী, সহকর্মী বন্ধুবান্ধব সবাই খবরটি পড়েছেন বা দেখেছেন, তার পরও এমন করে জিজ্ঞাসা করে ঘটনা জানতে চান যেন আমারই কোনো স্বজন মারা গেছেন। রক্তের সম্পর্কের না হোক যাঁরা মারা গেছেন তাঁরা তো স্বজনই, আমাদের আত্মার আত্মীয়। গত কয়েক মাসের নানা ঘটনা আর এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে বা খুঁজতে গিয়ে আমার মতো লাখ লাখ প্রবাসী ক্ষুব্ধ বা ক্লান্ত হয়েছেন। স্বদেশের এসব ঘটনায় মনটা খুব ছোট হয়ে গেছে, তার পরও আপন স্বদেশ, দেশমাতৃকা—সে তো মায়ের মতোই, তাকে কি ভুলে থাকা যায়?


সবশেষে ভালো খবরটি হলো, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর মান ও শ্রমিকদের অধিকার ও মানবেতর অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে বহু দিন থেকেই ইউরোপের নানা দেশে ক্লিন ক্লথ ক্যাম্পেইন বা এই জাতীয় সংগঠনগুলো ইউরোপীয় ক্রেতা কোম্পানিগুলোর ওপর শ্রম অধিকার লঙ্ঘন করে বাংলাদেশ থেকে সস্তায় তৈরি পোশাক আনার বিরোধিতা করে এই আধুনিক দাসপ্রথার বিরুদ্ধে চাপ দিচ্ছিল। সাভারের সাম্প্রতিক ট্র্যাজেডি আর তাদের আন্দোলনের ফলে এরই মধ্যে ২৩ মে জেনেভায় আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের সদর দপ্তরে ইউরোপের ৩১টি নামী পোশাক কোম্পানি বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর মান ও শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করবে বলে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।





কে বলে গো, সেই প্রভাতে নেই আমি ! -ফারুক ওয়াহিদ

( 0 Votes )

প্রবাসী লেখকদের কলাম


ফারুক ওয়াহিদ, ম্যানচেস্টার, ক্যানেটিকাট থেকে : বাংলা নামে যে দেশ- নাম তার বাংলাদেশ! আর এই বাংলাদেশ নাম উচ্চারণের সাথে সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে হয়। আমরা বাঙালি! এই পরিচয়টা দেওয়ার সাথে সাথে রবীন্দ্রনাথের কথাও এসে যায়। বাংলাদেশ এবং পৃথিবীর মধুরতম ভাষা আমাদের মায়ের ভাষা বাংলাভাষা, বাঙালি ও রবীন্দ্রনাথ একই সুতায় গাঁথা অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের বিশাল সাহিত্য ভান্ডার- বাংলার মাটি, বাংলার প্রকৃতি, বাংলার সরল মানুষ ও ভাষার সাথে একাকার হয়ে গেছে।

বিশ্বের দরবারে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি জাতিকে গর্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ রচিত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’ সঙ্গীতটি বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত- যা পৃথিবীর সবচেয়ে মধুরতম সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ‘মা, তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি’ এরকম শ্রুতিমধুর আবেগময় কথা পৃথিবীর কোনো জাতীয় সঙ্গীতে পাওয়া যাবে না এবং পৃথিবীতে শুধু একটি এবং একটি জাতীয় সঙ্গীতই রয়েছে যা পরিবেশন করলে বা শোনলে দু’নয়ন অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠে- সেটি হলো রবীন্দ্রনাথ রচিত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’ বাংলাদেশের আবেগময় জাতীয় সঙ্গীতটি। ৭ মে ১৮৬১ সালে এবং বঙ্গাব্দ ১২৬৮-র ২৫ বৈশাখ কলকাতার জোড়াসাঁকোর সম্ভ্রান্ত ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণকারী বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভা, কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, সঙ্গীত রচয়িতা, সুরস্রষ্টা, গায়ক, চিত্রশিল্পী, অভিনেতা, সমাজসেবী ও শিক্ষাবিদ এবং ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ রচনা করে নোবেল বিজয়ী বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এতকিছুর পরও আর কিছু বলার প্রয়োজন আছে কি!

এতকিছুর পরও রবীন্দ্রনাথ সস্পর্কে অনেক কিছু বলতে হয়। এই নোবেল বিজয়ীকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছিল কুখ্যাত বর্বর পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী। অসভ্য পাকিস্তানিদের চক্ষুশূল ছিল রবীন্দ্রনাথ। তাই বার বার পাকিস্তানিদের কাছ থেকে রবীন্দ্রনাথের উপর চরম আঘাত এসেছিল। রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন দেশের আমন্ত্রণে পৃথিবীর অনেক দেশ ঘুরেছেন এবং সকল দেশের শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন এবং এখনো আছেন।

পাকিস্তানিদের দৃষ্টিকোণ থেকে রবীন্দ্রনাথের বড় অপরাধ ছিল- তিনি ছিলেন খাঁটি বাঙালি এবং হিন্দু (প্রকৃত পক্ষে তিনি হিন্দু ছিলেন না, তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম) এবং তিনি বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডারে অনেক কিছু দিয়েছেন এবং বাঙালিকে সারা বিশ্বে গর্বের সাথে পরিচয় করে দিয়েছেন। আর এতো সব কারনেই বাঙালি বিদ্বেষী পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী হিংসায় উন্মত্ত হয়ে উঠে এবং রবীন্দ্র সঙ্গীত নিষিদ্ধ করে দেয় এক পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। পূর্বপাকিস্তানে হাস্যকরভাবে নতুন করে রবীন্দ্র সঙ্গীত রচনা করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগীয় প্রধান ড. মো. আবদুল হাই-কে চাপ দেওয়া হয়। ড. হাই ক্ষেপে গিয়ে মন্তব্য করেন- তিনি যদি রবীন্দ্র সঙ্গীত রচনা করেন তাহলে সেটাতো রবীন্দ্র সঙ্গীত হবে না- এটা হবে হাই সঙ্গীত। হতবাক স্তম্ভিত হয়ে যায় বাঙালিরাতো বটেই- সারা বিশ্ববাসী অবাক হয়ে যায় পাকিস্তানিদের কান্ড দেখে! সে সময় তীব্র প্রতিবাদ ওঠে সারাদেশে। পাকিস্তানি শাসক শ্রেণীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালন করেছে এদেশের মানুষ তথা বাঙালিরা।

সবচেয়ে অবাক কাণ্ড এই স্বাধীন বাংলাদেশেও রবীন্দ্রনাথ পাকিস্তান আমলের মতোই সাম্প্রদায়িক মানসিকতার দ্বারা বারবার আক্রান্ত হন। তাঁর রচিত আমাদের জাতীয় সঙ্গীতকেও পাকিস্তানি স্টাইলে আক্রমণ করা হয়- কিন্তু শেষ পর্য্যন্ত সেই অপশক্তি একাত্তরের মতো পরাজিত হয়। বাংলাদেশ ও ভারত যৌথভাবে রবীন্দ্র জন্মসার্ধশতবর্ষের অনুষ্ঠান আনুষ্ঠানিক ভাবে উদযাপন করে এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথাও ঘোষণা করেছেন।

রবীন্দ্রনাথের বিশাল সৃষ্টিভান্ডার- এর মধ্যে কাব্যগ্রন্থ ৫৬, গীতিপুস্তক ৪, ছোটগল্প ১১৯, উপন্যাস ১২, ভ্রমণকাহিনী ৯, নাটক ২৯, কাব্যনাট্য ১৯, চিঠিপত্রের বই ১৩, গানের সংখ্যা ২২৩২ এবং অঙ্কিত চিত্রাবলী প্রায় দুই হাজার। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ- কাব্য: সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালি, কল্পনা, ক্ষণিকা, গীতাঞ্জলি, বলাকা, পূরবী, পুনশ্চ, পত্রপুট, সেজুঁতি; উপন্যাস: গোরা, চতুরঙ্গ, ঘরে-বাইরে, শেষের কবিতা, চার অধ্যায়; ছোট গল্প: গল্পগুচ্ছ; নাটক: চিত্রাঙ্গদা, প্রায়শ্চিত্ত, রাজা, অচলায়তন, ডাকঘর, রক্তকরবী, তাসের দেশ, চণ্ডালিকা; প্রবন্ধগ্রন্থ: বিচিত্র প্রবন্ধ, শিক্ষা, শব্দতত্ত্ব, কালান্তর, সভ্যতার সংকট; ভ্রমণ কাহিনী: য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র, রাশিয়ার চিঠি, পারস্যে, জাপান যাত্রী; আত্মজীবনী: জীবনস্মৃতি; জীবনী: চরিত্রপূজা; পত্র-সাহিত্য: ছিন্নপত্র; গানের সংকলন: গীতিবিতান।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহ, শাহজাদপুরে ও পতিসর-এ জমিদারী দেখাশোনা করতে এসেই বাংলাদেশের মাটি-নদী ও মানুষের সাথে তার নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠে এবং কুষ্টিয়ার বাউল গান তথা সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত হন- বিশেষ করে লালন সাঁইয়ের গানে তিনি খুঁজে পেয়েছেন সম্প্রীতির ধারার পরিচয়। রবীন্দ্রনাথের অনেক গানই বাউল গানের সুরে রচিত- এমনকি ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’ বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতও কুষ্টিয়ার গগন হরকরা রচিত ‘আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যে রে’ এই গানটির সুর অবলম্বনে রচিত।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতা আমাদেরকে হানাদার পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত অবস্থায় উদ্বুদ্ধ করেছে এবং প্রেরণা জুগিয়েছে- অথচ এই রবীন্দ্রনাথকেই পাকিস্তানিরা নিষিদ্ধ করেছিল।

এদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশের জামাই বাবু। রবীন্দ্রনাথ বিয়ে করেছিলেন এই বাংলাদেশেরই খুলনার দক্ষিণডিহি গ্রামের মেয়ে ভবতারিণীকে এবং ঠাকুর বাড়ির নিয়ম অনুযায়ী বিয়ের পরে যার নুতন নাম দেওয়া হয় মৃণালিনী দেবী।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কাজী নজরুল ইসলামকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। কবি নজরুল হুগলী জেলে অনশন ধর্মঘট করলে রবীন্দ্রনাথ অনশন ভঙ্গ করার জন্য টেলিগ্রাম প্রেরণ করেন- “Give up hunger strike, our literature claims you.” এ সময়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বসন্ত’ নাটকখানি নজরুলকে উৎসর্গ করেন। 

৭ আগস্ট ১৯৪১ এবং বঙ্গাব্দ ১৩৪৮-এর ২২ শ্রাবণ দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণ ঘটে। কবি নজরুল ইসলাম রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে অত্যন্ত ব্যথিত হন এবং শোকে মূহ্যমান হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ‘রবি হারা কবি’ কবিতাটি লিখে ফেলেন।

কবি গুরুর ১৫২ তম জন্মবার্ষিকীতে পৃথিবীর ৩০ কোটি বাংলা ভাষাবাসী বাঙালির সাথে আজ আমরাও তাঁকে পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে স্মরণ করছি। রবীন্দ্রনাথ নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এভাবেই- “মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে/ মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।” রবীন্দ্রনাথ আজ আমাদের মাঝে নেই- কিন্তু তিনি বাঙালির চিন্তায়, চেতনায়, মননে সবসবয় জীবন্ত কিংবদন্তি হিসেবে উপস্থিত আছেন এবং চিরদিন থাকবেন-স্মৃতিতে অম্লান। রবীন্দ্রনাথতো এমন কথাই বলে গেছেন- যার পঙ্ক্তি শুনলে মুহূর্তে মন উদাস হয়ে যায় এবং নিশ্চিত চোখে পানি চলে আসবে-

“কে বলে গো, সেই প্রভাতে নেই আমি?
… আসব যাব চিরদিনের সেই-আমি।”

http://youtu.be/nZBUU7ZVs-o

-ফারুক ওয়াহিদ: প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা ও লেখক, ম্যানচেস্টার, ক্যানেটিকাট, যুক্তরাষ্ট্র






প্রবন্ধ : রেশমার কাহিনী : আল্লাহর রহমত ও কুদরত

( 0 Votes )

প্রবাসী লেখকদের কলাম


মোহাম্মদ খালেদ সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী : নিউইয়র্ক থেকে : সাভারে রানা প্লাজা ধসের ১৭ দিন পর রেশমাকে ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবত, অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে আনা একদিকে যেমন উদ্ধারকর্মীদের দক্ষ সফল অভিযানের অনন্য সাধারণ দৃষ্টান্ত, তেমনি এই ঘটনা আল্লাহর কুদরতি রহস্যমালার এক বিস্ময়কর উদাহরণও বটে। প্রথমেই পরম করুণাময় আল্লাহ তালার অজ¯্র শুকরিয়া-কৃতজ্ঞতার সাথে সাথে উদ্ধার অভিযান তৎপরতার সাথে নিবিড় ও সক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট উদ্ধার কর্মীদেরও এ প্রশংসনীয় তৎপরতার জন্য অভিনন্দন জানাতে হয়।

ইতিহাসের এ দুর্লভ ঘটনার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব ও অসীম ক্ষমতায় অবিশ্বাসীদের চিন্তা-চেতনায় আলোড়ন সৃষ্টি হওয়ার কথা। সঠিক পথের দিশারী হওয়ার পক্ষে এমন ঘটনা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বিশ্ব ইতিহাসের প্রতি তাকালে দেখা যাবে, আদিকাল থেকে যুগে যগে, দেশে দেশে ¯্রষ্টা মানুষকে নানাভাবে পরীক্ষা করে থাকেন, মানুষের অন্যায়-অত্যাচার, আল্লাহদ্রোহিতা তথা পাপাচারের শাস্তি দুনিয়াতে পাপিষ্ঠরা যেমন ভোগ করে থাকে, তেমনি তাদের সাথে সৎলোকদেরও ভোগ করতে হয়। আবার অভাবিতভাবে অনেকের প্রতি আল্লাহর করুণাও বর্ষিত হয়।

পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন জাতির জঘন্য পাপাচারের জন্য চরম ও কঠোর শাস্তির বহু কাহিনী বর্ণিত হয়েছে, বহু অবিশ্বাস্য, বিস্ময়কর ঘটনার কথাও বলা হয়েছে। মহাপ্রতাপশালী শাদ্দাদ, ফেরাউন, নমরুদদের ন্যায় রাজা-বাদশাহদের নির্মম ধ্বংসকাহিনী বর্ণিত হয়েছে। অলৌকিক অভূতপূর্ব বহু কাহিনীও রয়েছে।

যেমন আসহাবে কাহফ, হজরত মূসা (আ.)-এর নিরাপদে নীল দরিয়া পার হয়ে যাওয়া, ফেরাউনের লাশ অক্ষত রাখা, সুদীর্ঘ কাল মুত্যৃর পর হজরত সুলায়মান (আ.)-এর লাশ লাঠির ওপর দ-ায়মান থাকা, হজরত ইদ্রিস (আ.) ও হজরত ঈসা (আ.)-কে জীবত অবস্থায় আসমানে উঠিয়ে নেয়া এবং মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর মেরাজ ইত্যাদি বহু বিস্ময়কর অলৌকিক ঘটনা। তাছাড়া প্রায় চৌদ্দশ বছর পরে দু’জন বিশিষ্ট সাহাবীর অক্ষত লাশ ইরাকের সালমান পার্ক নামক স্থানে এনে দাফন করা, আরো কয়েকজন সাহাবীর অক্ষত লাশের সন্ধান পাওয়া, মৃত্যুর পর বিভিন্ন সময় কয়েকজনের জীবত হয়ে কথা বলা ইত্যাদিসহ আরো বিভিন্ন প্রকারের বহু অলৌকিক বিস্ময়কর ঘটনা রয়েছে, যা রেশমার ঘটনার চেয়েও বিস্ময়কর।
যেখানে আল্লাহর গজবের অবতরণ, সেখানে তার রহমতের বিচরণ মানুষের পরীক্ষারই নিদর্শন।

সাভার ট্র্যাজেডি বাংলাদেশের স্মরণাতীত কালের মনুষ্যসৃষ্ট এক মহাদুর্যোগ। গত ২৪ এপ্রিল সকাল থেকে ৯ মে দুপুর পর্যন্ত ১৭ দিন রানা প্লাজার করুণ দৃশ্য, কঠোরতম উদ্ধার অভিযানের প্রতি গোটা দেশবাসীর দৃষ্টি গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সাথে নিবদ্ধ ছিল। অধীর আগ্রহে চোখগুলো উদ্ধার তৎপরতার প্রতি তাকিয়ে থাকে যদি কোনো জীবিত প্রাণ উঠে আসে। কিন্তু উদ্ধার অভিযানের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হওয়ার পর থেকে শুধু লাশ আর লাশের সারি। প্রথম উদ্ধার অভিযানে প্রায় আড়াই হাজার জীবিত লোক উদ্ধারের পর লাশের সংখ্যা উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে। আশা-নিরাশায় দোদুল্যমান অবস্থা চলতে থাকে গত শুক্রবার ৯ এপ্রিল দুপুর পর্যন্ত। বরং বলা যায়, ধ্বংসস্তূপে আর কোনো প্রাণের স্পন্দন আশা করা যায় না। জানা যায়, উদ্ধার অভিযান বেগবান করার প্রস্তুতি চলে যেন ধ্বংসস্তূপে লাশের সন্ধান পাওয়া গেলে তা দ্রুত স্থানান্তরিত করা যায়।

আগেই বলে রাখতে চাই সাভার ট্র্যাজেডির বিবরণ দান করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। শুক্রবার (৯ এপ্রিল) দুপুরের পর রানা প্লাজা ধ্বংসলীলার মধ্যে যে এক অভাবনীয় বিস্ময়কর ঘটনার অবতারণা টিভি পর্দায় তা প্রত্যক্ষ করে যে অনুভূতি হয়েছে, তা উদ্বুদ্ধ করেছে আল্লাহর কারিশমা, যা রেশমার ক্ষেত্রে প্রদর্শিত হয়েছে, সে সম্পর্কে এখানে আরো কিছু অলৌকিক তথ্য পরিবেশন করার। প্রথমে রেশমা। রেশমার গ্রাম দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার কোশিগাড়ি। রেশমার বাবা আনসার আলী ১৭ বছর আগে মারা যান। পরে একই এলাকার আরজান আলী নামে এক ব্যক্তি রেশমার মা জবেদাকে বিয়ে করেন। জবেদার আগের স্বামী আনসার আলীর ছেলে সাদেক আলী ও জাহেদুল ইসলাম এবং মেয়ে আসমা ফাতেমা ও রেশমা। রেশমা সবার ছোট। চার বছর আগে রাজ্জাক নামে এক ছেলের সঙ্গে রেশমার বিয়ে হয়। ৬ মাস আগে রাজ্জাক রেশমাকে ছেড়ে পালিয়ে যায়।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত বিবরণে আরো বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে রেশমা রানা প্লাজার তৃতীয়তলায় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করছিলেন। রেশমার বড়বোন ফাতেমা বেগম জানান, সাভার ট্র্যাজেডির পর থেকে আমি সবসময় টিভি দেখতাম আর আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতাম বোনকে ফিরে পাওয়ার জন্য। যখন টিভিতে রেশমাকে দেখতে পাই তখন আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। আল্লাহ আমার কথা শুনেছেন। তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন আমার বোনকে। মেয়ের জীবত উদ্ধারের খবর শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন রেশমার  মা জবেদা খাতুন। দীর্ঘদিন মেয়ের অপেক্ষায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তিনি।

রেশমার মা জবেদা খাতুন, দুই ভাই ও বোন আসমা রেশমা নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই রয়েছেন সাভারে। রেশমার অক্ষত লাশ পাওয়ার আশাও ছেড়ে দিয়েছিলেন। উনিশ বছর বয়সী রেশমার সংসার জীবন কাটে স্বামীর নিষ্ঠুর নির্যাতনে। তাকে না খেয়েও থাকতে হতো অনেক সময়। তার নিষ্ঠুর স্বামীর অকথ্য নির্যাতনের কাহিনীও প্রকাশিত হয়েছে। রেশমার স্বামী রাজ্জাক তার খোঁজখবর পর্যন্ত রাখত না। কিন্তু রেশমা উদ্ধারের পরপরই রাজ্জাক নামক একজন ব্যক্তি  তাকে স্ত্রী বলে দাবি করে, পরে সেনা কর্মকর্তারা তাকে রেশমার কাছে নিয়ে গেলে লোকটি তার স্বামী নয় বলে রেশমা জানান।

সাভারের বাজার রোড এলাকায়  নুরু মিয়ার বাড়িতে ভাড়া থাকতেন রেশমা ৪১৬ ঘণ্টা পর অর্থাৎ ১৭ দিন পর মৃত্যু উপত্যকা হতে উদ্ধার করা হয় তাকে। রানা প্লাজার বেজমেন্ট থেকে পৌনে এক ঘণ্টার চেষ্টায় এবং বিকাল ৪টা ২৬ মিনিটে রেশমাকে উদ্ধার করে আনেন উদ্ধারকর্মীরা। পোশাককর্মী রেশমা ধ্বংসস্তূপ থেকে যখন জানান, তিনি বেঁচে আছেন, এ সংবাদ গণমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার সাথে সাথে বিদ্যুৎগতিতে ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। রেশমার উদ্ধার কাহিনী গোটা বিশ্বকে বিস্মিত করেছে নিঃসন্দেহে। সাভারের শোকাবহ পরিবেশে, লাশের পর লাশ উঠে আসার করুণ অবস্থায় এহেন এক পরম আনন্দের সংবাদ, সুসংবাদ।

১৭ দিন পর এই প্রায় অবিশ্বাস্য অলৌকিক সংবাদ সবার মাঝে এক অভাবিত আলোড়নের সৃষ্টি করে। রেশমাকে যেন সুস্থভাবে জীবিত উদ্ধার করা যায়, সেজন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া প্রার্থনার জন্য ঘনঘন আহ্বান জানানো হতে থাকে। উপস্থিত হাজার হাজার জনতার কণ্ঠে শ্রোত হতে থাকে আবেগময় প্রার্থনা। ধ্বংসস্তুপের নিকটে অনবরত কোরআন তেলাওয়াত হতে থাকে। সবারই একই আকুতি, আল্লাহ যেন রেশমাকে সুস্থ, জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে দেন। উদ্ধারকর্মীরা রেশমাকে অক্ষত অবস্থায় তুলে আনেন। নারায়ে তকবীর, আল্লাহু আকবর ধ্বনিতে পরিবেশ মুখরিত হয়ে ওঠে।
আল্লাহর অপার মহিমার বাস্তব নিদর্শন মৃত্যুঞ্জয়ী রেশমার এ অলৌকিভাবে বেঁচে যাওয়ার কোনো ব্যাখ্যা দিতে বিজ্ঞান অক্ষম। সর্বশক্তিমান আল্লাহর কুদরতের একটি অতিক্ষুদ্র নমুনা রেশমার অক্ষত জীবিত উদ্ধার হয়ে আসা।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এরূপ অলৌকিক ঘটনা এটি প্রথম হলেও বিগত প্রায় সিকি শতকে বিশ্বের নানাস্থানে এরূপ দৃষ্টান্তের অভাব নেই। উদাহরণ স্বরূপ সংবাদপত্রে প্রকাশিত বেশ কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ভূমিকম্প, ভবন ধস ইত্যাদি ধ্বংসলীলায় চাপা পড়ে, আটকা পড়ে বহুদিন পর জীবিত উদ্ধার পাওয়ার ঘটনাবলির প্রত্যেকটি আল্লাহর অসীম কুদরতেরই জ্বলন্ত নিদর্শন। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ২০০৫ সালে পাকিস্তানে ৪০ বছরের নারী নাকশা বিবিকে ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয় ৬৩ দিন পর। দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে হাইতিতে ২০১০ সালে। হাইতির নাগরিক ইভানসকে ভুমিকম্পের ধ্বংসস্তুপের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় ২৭ দিন পর।

চতুর্থ ঘটনাটি ঘটে ১৯৯৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায়। সিউলে ধসে পড়া একটি বহুতল শপিং কমপ্লেক্সের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ১৬ দিন পর জীবিত উদ্ধার হন এক ব্যক্তি।
ফিলিপাইনে ঘটে পঞ্চম ঘটনাটি। ১৯৯০ সালে ভূমিকম্পে ধসে পড়া একটি হোটেলের নিচে চাপা পড়া এক ব্যক্তিকে চৌদ্দ দিন পর সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ষষ্ঠ ঘটনাটি ইরানের। ২০০৪ সালে ভূমিকম্পে ধসে পড়া বাড়ির নিচে চাপা পড়া বৃদ্ধাকে ৯ দিন পর অবিশ্বাস্যভাবে অক্ষত অবস্থায় জীবিত উদ্ধার করা হয়।

মোহাম্মদ খালেদ সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী

একথাও বিশ্বাস করতে হবে যে, মানুষের জীবনে আপতিত বহু বিপর্যয় মানুষেরই কৃতকর্মের ফল। মানুষ ভুল করলে সে ভুলের মাসুল তাকে দিতে হবে। পাপ করলে পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়। আল্লাহতালা কোরআনের নানাস্থানে স্পষ্ট বলেছেন যে, তোমাদের উপর যে বিপদাপদ পতিত তা তোমাদেরই কৃতকর্মের ফল। আবার এমনও বলেছেন যে, তোমরা নিজেদের ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, অনেক বিপদ-বিপর্যয় মানুষরাই ডেকে আনে।

উদাহরণস্বরূপ আলোচ্য ধ্বংসপ্রাপ্ত রানা প্লাজার কথাই ধরা যাক। এর জমির মালিকানা, ক্রয়-বিক্রয়, নির্মাণকার্যে অসাধুতা, দুর্নীতি প্রভৃতি সম্পর্কে যেসব তথ্য উদ্ঘাটিত হচ্ছে, তাতে সততা, ন্যায়পরায়ণতার পরিবর্তে আত্মসাৎ, অন্যের অধিকার হরণ ইত্যাদি অন্যায়-অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তা যথার্থ ও সত্য প্রমাণিত হলে আইনের এবং ধর্মের দিক থেকে স্থাপনাটির অস্তিত্বই অবৈধ বিবেচিত হওয়ার কথা। ফলে ভেজাল কৃত্রিমতার পরিণতির জন্য কে দায়ী। বস্তুত, সৎ লোকের দ্বারা কখনো অন্যায়, পাপাচার, অপকর্ম সাধিত হতে পারে না, তবে মানুষ মাত্রই যেহেতু ভুল-ভ্রান্তির শিকার হতে পারে, সে ভুলের মাসুল ভোগ করা ও স্বাভাবিক তওবা করলে আল্লাহ ক্ষমাও করতে পারেন। অনেক পাপকর্ম কিন্তু কারো অপকর্ম, পাপাচারের কারণে আল্লাহর পক্ষ হতে কোনো বিপদাপদ পতিত হলে বিপর্যয় ঘটলে তাতে সৎ, নিরীহ, নিরপরাধ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়Ñএটাই বিধাতার বিধান।

এরূপ আকস্মিক দুর্ঘটনা-বিপর্যয়ে যারা প্রাণ হারায়, মারা যায় তাদের মধ্যে বিশ্বাসী কিছ লোক শহীদি মর্যাদার অধিকারী হয়ে থাকে। যেমন অন্যায়ভাবে করা, নিহত হওয়া, আগুনে পুড়ে মরা বা পুড়িয়ে মারা, পানিতে ডুবে মরা  বা ডুবিয়ে মারা, স্থলে, পানিতে, হিং¯্র প্রাণীর আহার হওয়া, ভবন ধসে পতিত হয়ে কঠিন রোগে মারা যাওয়া, ন্যায্য অধিকার তথা ধনসম্পদ ইত্যাদি রক্ষায় নিহত হওয়া, সীমান্ত  রক্ষায় নিহত হওয়া, অলঙ্ঘিত সীমায় অবস্থান করে বৈধ আত্মস্বার্থ রক্ষায় দ্বীন, ধর্ম প্রতিষ্ঠার আহ্বানে যারা অন্যায়ভাবে নিহত হয়, মারা যায় তারা বিশ্বাসী মুসলমান গণশহীদ বলে বিবেচিত। মিল কারখানা প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক কর্মচারী এবং মালিক কর্তৃপক্ষের মধ্যে উভয় শ্রেণীর লোকই থাকতে পারেন যারা নিজ নিজ স্থানে ন্যায় ও সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। তবে সত্যাসত্য আল্লাহই ভালো জানেন।






টরন্টোর বাংলাদেশিরা

( 0 Votes )

প্রবাসী লেখকদের কলাম


ফারুক মঈনউদ্দীন : টরন্টো, কানাডা থেকে : ওয়ার্ডেন অ্যাভিনিউ থেকে ড্যানফোর্থে ঢুকে কিছু দূর এগোলেই লাল ইটের একটা সাদামাটা ঘর। ইংরেজি ও বাংলায় ‘বায়তুল মোকাররম মসজিদ’ লেখা না থাকলে বোঝার কোনো উপায় নেই যে এটি মসজিদ। বাইরে থেকে দেখা কলকাতার পাতালরেলের স্টেশনের মতো বৈশিষ্ট্যহীন একটা বড় বাক্সের মতো ঘর। কেবল জানালার মতো নকশাগুলোর ধনুকাকৃতি দেখে ইসলামি স্থাপত্যের চিহ্ন পাওয়া যায়। আসরের নামাজের সময় কখনো ওদিক দিয়ে গেলে দেখা যায় সাদা জোব্বা পরা দু-একজন কিশোর দরজা খুলে ঢুকে পড়ছে মসজিদের ভেতর। তার পাশেই ওয়ানস্টিড ইউনাইটেড চার্চ। বায়তুল মোকাররম মসজিদ ছাড়িয়ে আরও এগিয়ে গেলে আধা কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে সেন্ট ডানস্টান ক্যাথলিক গির্জা। তার পরই বায়তুল আমান মসজিদ এবং সান্ধ্য ও সাপ্তাহিক ইসলামি শিক্ষা কেন্দ্র। এটি পেরিয়ে গেলে বাংলা টাউন। ড্যানফোর্থ অ্যাভিনিউর একপাশ জুড়ে পর পর প্রায় সবগুলো বাংলাদেশিদের দোকানপাট, রেস্তোরাঁ, ব্যবসায়িক অফিস। ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা সাইনবোর্ড এবং চারপাশে বাংলাদেশি চেহারার মানুষজন দেখে বিদেশ বলে মনে হয় না।

আজকাল পত্রিকা অফিসের ঠিক উল্টোপাশে ‘কফি টাইম’ নামের ফাস্ট ফুডের দোকান, ‘টিম হর্টনস’-এর মতো জাঁদরেল চেইন-এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে দাঁড়ানো। ভেতরে ঢুকলে মনে হয় ঢাকার কোনো কফি শপ, সব টেবিলে বাংলাদেশি চেহারা। বাইরে টিপ টিপ বৃষ্টিভেজা সন্ধে, ভেতরে এক কাপ কফি নিয়ে গল্প করছে সবাই। বাংলাদেশের কোনো রেস্তোরাঁর দেয়ালে যেমন লেখা থাকে ‘রাজনৈতিক আলোচনা নিষেধ’, এটির দেয়ালেও একটা বোর্ডে নোটিশ লেখা যে ৩০ মিনিটের বেশি যাতে কেউ টেবিল দখল করে না রাখে। অন্যান্য পিক আওয়ারে এই নির্দেশ পালিত হলেও বিকেলের এই অলস সময়ে বোধকরি তার বাধ্যবাধকতা নেই।

কবি-সাংবাদিক সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল প্রায় সাত বছর ধরে কানাডায় বসবাসরত। কানাডা যাবেন কেন যাবেন বইটির জন্য ওকে অনেকেই কানাডায় অভিবাসন-বিশেষজ্ঞ বলে মনে করেন। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ হয়তো কোনো বাংলাদেশি তরুণ এসে ওকে থামিয়ে বলছেন, একটু কথা বলা যাবে? উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেও ও ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে বলছে, জি বলেন। কথায় কথায় জানা যায়, ভাগ্যান্বেষী তরুণ টরন্টোয় এসেছেন কিছু করার আশায়। দুলাল অভিজ্ঞ উকিলের মতো জেরা করছে, কখন এসেছেন, কী ভিসায় এলেন, দেশে থাকতে কী করতেন, অন্য কোনো শহরে চেষ্টা করেছেন কি না ইত্যাদি। বিভ্রান্ত সেই তরুণ হয়তো শুনেছেন কানাডায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অঘোষিত উপদেষ্টা দুলালের কথা, কিংবা ওর বইটির নাম-অধ্যায়টা পড়েছেন।

দুলালের চেহারায় অস্বস্তির ছাপ, বিব্রতবোধে বিপন্ন, কারণ ভাগ্যান্বেষী এই যুবককে টরন্টোর বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা বললে হয়তো ওকে ভুল বুঝবেন। আবার কানাডায় অভিবাসন কিংবা কাজের সুযোগ সম্পর্কে ভুল তথ্য দিতে অনিচ্ছুক দুলাল। কানাডার সোনার হরিণের পেছনে ছুটে দেশে সবকিছু ছেড়ে এখানে চলে আসার বিষয়ে মানুষকে নিবৃত্ত করতে চেয়ে বহু মানুষের ভুল-বোঝাবুঝির শিকার হতে হয়েছে ওকে। ভুল বোঝা মানুষের ধারণা, ও যেহেতু এত বছর ধরে রয়ে গেছে, এখানে নিশ্চয়ই কাজের অবাধ সুযোগ, অথচ নতুন আসা মানুষকে নিরস্ত করার চেষ্টা করছে ও। তাই আজকাল মানুষকে আর বাস্তব ধারণা দিতে আগ্রহী নয় ও, আবার মিথ্যে আশ্বাসও দেয় না, তাই কর্মপ্রত্যাশী সেই যুবককে একটা অস্পষ্ট গা ছাড়া জবাব দিয়ে কাজ সারে ও।

অভিবাসনপ্রত্যাশী মানুষ দীর্ঘদিনের অভিবাসীদের যন্ত্রণা উপলব্ধি করতে অক্ষম। দেশের অনেক কিছু ছেড়ে আসা মানুষ ভাবে, টরন্টোতে কোনোভাবে গিয়ে পৌঁছাতে পারলেই যেকোনো ধরনের কাজ জুটে যাবে। অথচ বাংলাদেশের কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা এখানে কাজে লাগে না। দেশ থেকে ডাক্তারি পাস করে আসা কেউ ট্যাক্সি চালাচ্ছেন, কেউ গ্রোসারি শপে মাংস কাটছেন, আবার কেউ কেউ নার্সিংয়ে নিচ্ছেন স্থানীয় ডিপ্লোমা।

দেশের সহায়-সম্বল বিক্রি করে বাংলাদেশের যেসব মানুষ ভাগ্যান্বেষণে ক্রমাগত ছুটছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, তাদের অনেকেরই মোহভঙ্গ হয় বিদেশের বৈরী পরিবেশে পা ফেলার পর, শুরু হয় মানবেতর জীবনযাপন। আবার অসৎ আদম ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ে দেশে ফিরে আসা সর্বস্বান্ত মানুষের কান্নায় প্রায়ই ভারী হতে দেখা যায় ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। অথচ তবু বহু মানুষ দেশান্তরি হওয়ার জন্য জীবন বাজি রাখতেও প্রস্তুত। বিমানের চাকার খোলে বসে দেশ ছেড়ে চলে যেতে চেয়ে ঊর্ধ্বাকাশে আত্মাহুতি দেওয়ার মতো ঘটনা বিশ্বের আর কোথাও কখনো ঘটেছিল কি না আমাদের জানা নেই। হতভাগ্য সেই যুবকের ব্যর্থ চেষ্টাই যেন আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠিত-অপ্রতিষ্ঠিত, শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত মানুষের বিদেশে ভাগ্যান্বেষণের প্রাণের আকুতি।

কানাডায় পাড়ি দেওয়া মানুষের মধ্যে সচ্ছল এবং সফল একটা অংশ কানাডায় জীবনযাপন ও অবস্থানের ব্যাপারে সম্পূর্ণ ইতিবাচক ও পরিতৃপ্ত। ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা চাকরিতে খুব ভালো অবস্থানে থাকা অনেকেই আছেন, যাঁরা অভিজাত এলাকায় বাড়ি কিনে, সন্তানদের জন্য বেবি সিটারের ব্যবস্থা করে পরিপূর্ণ স্থিতিশীল জীবনযাপন করছেন। বলা বাহুল্য, দীর্ঘদিন আগে কানাডায় পাড়ি দেওয়া এই শ্রেণীর মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তবে এই স্থিতিশীল অবস্থা যেকোনো সময় নড়ে যেতে পারে আচমকা কর্মচ্যুত হলে। দ্বিতীয় দলের অধিকাংশই, যাঁরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কানাডা এসেছেন, তাঁরা শিগগিরই উপলব্ধি করতে পারেন যে কানাডার জীবন তাঁদের জন্য নয়, অথচ দেশ ছেড়ে চলে আসার পর সেই মোহমুক্তির প্রমাণ দিতেও কুণ্ঠিত তাঁরা। আইবিএ থেকে এমবিএ করা একটি বেসরকারি ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদমর্যাদার একজন ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে সপরিবারে পাড়ি দিয়েছিলেন কানাডা, কিন্তু বছর না ঘুরতেই তিনি আত্মহত্যা করেন কোনো অজ্ঞাত কারণে। পরিচিতদের ধারণা, মোহভঙ্গ ও হতাশাই ছিল এই অকাল স্বেচ্ছামৃত্যুর মূল কারণ। গত কয়েক বছরের মধ্যে এ রকম আত্মাহুতি দেওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা কমপক্ষে তিনজন, এঁদের সবাই উচ্চশিক্ষিত।

আবার ছেলেমেয়ের পড়াশোনা এবং দেশের নানান অব্যবস্থা, রাজনৈতিক হানাহানি, নাগরিক জীবনের যন্ত্রণা ও অনিয়মের কারণে দেশের প্রতি বীতশ্রদ্ধার জন্যই অনেকে উভয়সংকটে পড়েন। ফলে এই শ্রেণীর অভিবাসীরা ঝুলে থাকেন এক ত্রিশঙ্কু অবস্থায়। এই দলের সবারই অভিজ্ঞতা অনুযায়ী যে ধরনের সুযোগ-সুবিধার হাতছানি দিয়ে কানাডায় অভিবাসী হতে ইচ্ছুক বিদেশিদের আসতে দেওয়া হয়, বাস্তবে তেমনটি পাওয়া যায় না, ফলে শিগগিরই মোহমুক্তি ঘটে সবার।

বাংলাদেশি অধ্যুষিত ভিক্টোরিয়া পার্ক এলাকার বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে বসবাসকারী একজন অভিবাসীর ফ্ল্যাটে মাত্র দেড় ঘণ্টার অনুপস্থিতিতে দরজা ভেঙে চুরি হয়ে গেলেও পুলিশ কোনো সুরাহা করতে পারেনি বটে, তবে তদন্ত শেষে এই দুঃসাহসিক চুরির শিকার পরিবারটিকে চিঠি পাঠিয়ে ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র সুরক্ষার ব্যাপারে নসিহত করা হয়েছে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো। কিন্তু তবু দেশে ফিরে যাওয়ার মতো প্রত্যাবর্তনের লজ্জায় পড়তে চান না বলে অনেকেই অনিচ্ছায় কাটিয়ে যাচ্ছেন যন্ত্রণাময় দিন। সমীক্ষায় দেখা যায়, কানাডায় অভিবাসী হতে আসা ৫ শতাংশ ফিরে যায়, নাগরিকত্ব লাভের প্রক্রিয়ায় আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকে ৫ শতাংশ, ১০ শতাংশ পেশাগত চাকরি পায়, আর ৮০ শতাংশই নিউ ইমিগ্র্যান্ট ফাঁদে পড়ে (সূত্র: কানাডা যাবেন কেন যাবেন)।

সন্তানদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক শিক্ষা নিয়ে উৎকণ্ঠিত অনেক বাবা-মা দেশে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবলেও খোদ সন্তানদের অনিচ্ছার কারণে সেটি সম্ভব হয়ে উঠছে না। তাই অন্তত পক্ষে কন্যাসন্তানদের কিছুটা ধর্মীয় বোধ জাগানোর জন্য অনেক মা-বাবা মেয়েদের মাথায় হিজাব বাঁধার শিক্ষা দিয়েছেন, তাই স্কুলগুলোতে দেখা যায় বহু কিশোরীর মাথায় হিজাব বাঁধা থাকলেও অন্যান্য পোশাক কোনো অর্থেই রক্ষণশীল মুসলমানদের পর্দামাফিক নয়।

অভিবাসী নারীদের একটা বহুল উচ্চারিত অভিযোগ স্বামীদের বিরুদ্ধে যে তাঁরা ঘরের কাজে স্ত্রীকে সাহায্য করতে অনাগ্রহী, কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে অদক্ষ, যা সহজাত এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার ফসল। ফলে দেশে থাকতে যাঁরা গৃহপরিচারিকার সহায়তায় অনায়াসে দিন কাটিয়েছেন, তাঁদের এখানে এসে বাচ্চা সামলানো থেকে ঘরের বেশির ভাগ কাজই করতে হয়। অথচ দুলালের ভাষায় কানাডা ‘হিউম্যান রাইটস’-এর দেশ নয়, বরং বলা যায় ‘উওম্যান রাইটস’-এর দেশ। কারণ, এ দেশে নারীদের স্বার্থ সত্যিকার অর্থেই সুরক্ষিত।

তবে বাংলাদেশি অভিবাসী নারীরা সেই অধিকার ভোগ করতে বা প্রয়োগ করতে অক্ষম কিংবা যথেষ্ট সাহসী নন। বিদেশের মাটিতে এত বৈরী পরিবেশের মধ্যেও কানাডার ইমিগ্রেশন বিভাগে বহু দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে, যেখানে এক বাংলাদেশি অন্য স্বদেশির বিরুদ্ধে চিঠি লিখে তাঁর অভিবাসন-প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে চেষ্টা করেছেন।

তবু অভিবাসী হতে চাওয়া মানুষের একটি জীবন কেটে যাবে স্বদেশ-বিদেশের দোলাচলে, তার পরও এই দুই বিকল্পের কোনটি শ্রেয়তর, সেটি বুঝে ওঠার জন্য হয়তো কেউ কেউ একবার ভাগ্যান্বেষণের চেষ্টা করে দেখবেন টরন্টো, ভ্যাঙ্কুবার, মন্ট্রিয়ল কিংবা অটোয়ায়।

টরন্টো, কানাডা
ফারুক মঈনউদ্দীন : লেখক ও ব্যাংকার।




মাকে মনে পড়ে - এবিএম সালেহ উদ্দীন

( 1 Vote )

প্রবাসী লেখকদের কলাম


এবিএম সালেহ উদ্দীন : নিউইয়র্ক থেকে :  মা। এক অক্ষরের একটি শব্দ। কিন্তু এর তাৎপর্য ব্যাপক। জগতে মায়ের সাথে আর কেউকে তুলনা করা যায় না। মা অতুলনীয়। মহান আল্লাহ পাক মাকে সব কিছুর উর্দ্ধে মর্যাদা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন। বিশ্বনবী (দ) বলেছেনÑ“মা হচ্ছেন সমগ্র জাহানের শ্রেষ্ঠ সন্মানীয় নিয়ামত। মাকে কখনও কষ্ট দেয়া যাবে না, অসন্মান করা যাবে না।” তিনি আরো বলেছেনÑ“ পৃথিবীর সবচাইতে নিকৃষ্ট ও পাপিষ্ঠ সে ব্যক্তি;যে তার মাকে কষ্ট দেয়, মাকে অসন্মান করে(?) সে অবশ্যই অভিশপ্ত।” সন্তানের প্রতি মায়ের øেহ ও ভালোবাসা অকৃত্রিম। পৃথিবীর কোন কিছুর সঙ্গে মায়ের মায়া-মমতার তুলনা হয় না। অর্থ্যাৎ মহা-মহিম আল্লাহ ও রাসুলে পাকের পরই মায়ের স্থান। হাদিসে আছেÑ ‘মায়ের পদতলেই সন্তানের বেহেস্ত।’ অতএব মর্যাদাগত ভাবে দুনিয়া-জাহানে মায়ের সমকক্ষ আর কেউ নয়। মায়ের তুলনা মা-ই।

বিশ্বচরাচরে মায়ের মর্যাদাকে উচ্চকিত রাখার তাগিদ হচ্ছে মানবধর্মের অন্যতম শিক্ষা। মাকে যেনো অবহেলা না করা হয়। ইসলামে মাতা-পিতার প্রতি অসন্মান ও অবহেলা প্রদর্শন মহা পাপ। এটি ক্ষমাহীন অপরাধ। মাতা-পিতার সন্মান ও মর্যাদা রক্ষার তাগিদে পৃথিবীর সকল ধর্ম এবং মনীষীদের অসংখ্য উক্তি আছে। এ মুহুর্তে রাধারানী দেবীর একটি উক্তি মনে পড়ছেÑ“ মা মা-ই। মায়ের সাথে পৃথিবীর আর কিছুর তুলনা চলে না।” এ ব্যাপারে নিপোলিয়ানের একটি বিখ্যাত উক্তি আছে। তিনি বলেছেনÑ“ একটি দেশের পুনরুজ্জীবনের জন্য বিশেষ কিছুরই দরকার হয় না, কেবল মাত্র দরকার হয় কিছু সংখ্যক সু-মাতার।”

পৃথিবীতে সৌভাগ্যবান তিনি,যিনি মায়ের আদর, মায়া-মমতা ও øেহ-পরশে বড় হয়েছেন এবং মাকেই সবকিছুর উর্দ্ধে মর্যাদা দিয়েছেন। আবার এমন অনেক সন্তান আছেন, যারা শিশুকালে মা হারিয়েছেন। মাযের আদর ও øেহ বঞ্চিত হয়েছেন কিন্তু বড় হয়ে কখনো মাকে ভুলে যান নি। জীবনভর মায়ের মর্যাদাকে বক্ষে ধারণ করে ধন্য হয়েছেন।
মহানবী(দ) জন্মের আগেই পিতৃহাঁরা হয়েছিলেন এবং জন্মের চার বছরের মাথায় প্রাণপ্রিয় মাকে হাঁরিয়েছেন। মাতা-পিতার আদর-øেহ বঞ্চিত নিদারুণ দু:খবোধ অন্তরজ্বালা নিয়ে মা-বাবার আবাল্য অস্ফুট স্মৃতিকে বক্ষে ধারণ করেই তিনি মহামহিমের নৈকট্যের পূর্ণ প্রাপ্তির মাধ্যমে জগতের সকল মায়ের প্রতি অপার শ্রদ্ধাবোধ ও সন্মান প্রদর্শনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। মহানবীর চিরকালের নির্দেশনা হচ্ছে ‘জগতের সকল মাযের মর্যাদাকে সমুন্নত রাখতে হবে। এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ-অসিদ্ধ সন্তানই দুর্ভাগা এবং সে অভিশপ্ত।’
মায়ের দু:খ-কষ্ট ও বেদনা মোচনে সর্বাগ্রে সন্তানকেই এগিয়ে আসতে হবে। মাকে অসন্তষ্ট রেখে কিংবা অবহেলা করলে দুনিয়ায় অভিশপ্ত জীবন আর পরকালে ক্ষমাহীন কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হবে।

এ পৃথিবীর কোন কোন মা সন্তানের নিকট থেকে অবহেলার শিকার হয়েছেন। মা অভিশাপ না দিলেও পাপিষ্ট সন্তানের ভাগ্যে জুটেছে  জগতধিকৃত অভিশাপ নিয়ে নি®প্রদীপ ধিকৃত জীবনপাতের ঘটনা।

মায়ের খুশি ও সন্তুষ্টির উপর সন্তানকে সদা সচেতন এবং হতে হবে দায়িত্ববান। দুখিনী মায়ের কষ্টবোধকে বিদূরিত করার জন্য সন্তানকে সচেষ্ট থাকতে হবে। বড় পীর আবদুল কাদের জিলানী(র) এর  শিশুকালের একটি ইতিহাস বিখ্যাত ঘটনা। যিনি কুরআন হাফেজ অবস্থায় জন্মেছিলেন। একবার রাতে তাঁর মমতাময়ী মা শুয়েছিলেন এবং  আদরের শিশুর কাছে পানি চাইলেন। শিশু আ: কাদের পানি নিয়ে এসে দেখেন মা ঘুমিয়ে পড়েছেন। তিনি পানির গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে রইলেন। রাত পোহানোর আগে মা ঘুম থেকে উঠে দেখেন  তার সন্তান পানির গ্লাস হাতে নিয়ে কম্পিত শরীরসহ দন্ডায়মান ! সারা রাত শিশু বাচ্চাটি পানি হাতে দাঁড়িয়েছিলেন! এ দৃশ্য অবলোকন করে মা তো হতভম্ব। শিশুটির তুলতুলে পা দুটি ফুলে গেছে এবং সারা শরীর কাঁপছে। বাচাধনকে বুকে টেনে মা হাউমাউ কেঁদে উঠলেন। মায়ের ঘুমের বেঘাত হবে,কষ্ট হবে ভেবে মাকে জাগান নি। মহীয়সী মায়ের দোয়ায় তিনি আজ জগদ্বিখ্যাত।
তেমনি মমতাময়ী মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর এক মহা দুর্যোপূর্ণ ঝড়-বৃষ্টির ঘোরতর অন্ধকার রাতে একটি বিরাট স্রোতবাহি নদী সাঁতরিয়ে পার হয়ে কঠিণ কষ্টের মধ্য দিয়ে মায়ের সান্নিধ্যে পৌঁছে জগদ্বিখ্যাত হয়েছিলেন। মায়ের প্রতি কর্তব্য ও দায়িত্ববোধের এমন বহু দৃষ্টান্ত আছে।

সন্তানের জন্য,সন্তানের সুখের লাগি মায়ের ত্যাগ ও কষ্টের কোন তুলনা নেই। সমগ্র জাহানের কোন কিছুর সঙ্গে মায়ের অবদানের তুলনা করা যাবে না। হাদিসে আছেÑ“ মাতা-পিতার আনন্দে খোদার আনন্দ এবং পিতা-মাতার অসন্তুষ্টিতে খোদা অসন্তুষ্ট।”

অতএব মাকে কখনও অবজ্ঞা করা যাবে না। অসন্মান করা যাবে না। মায়ের অধিকার রক্ষা করেই মহত্ব অর্জন করতে হবে। কারণ পৃথিবীতে মহৎ মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে একজন সুমাতার অবদানই সবচেয়ে বেশি। শ্রেষ্ঠ মানুষেরা কখনো তাদের মাকে অমর্যাদা করেন নি।

পৃথিবীতে মা নিয়ে যত গল্প-কবিতা ও গান আছে। মায়ের মর্যাদা রক্ষার তাগিদ আছে। আর কিছুতে তা নেই। সকল ভাষা,সকল ধর্ম আর সকল জাতির মুখে মা নামটি একযোগে যেমন উচ্চারিত হয়। তেমনটি আর কিছুতে হয় না। জগতে একমাত্র মায়েরই কোন প্রতি শব্দ নেই। মা মা-ই। সবাই সকল ভাষায় মাকে মা বলেই ডাকেন। মায়ের চিরত্ব ও মর্যাদার জন্য এমন বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত আর কিছুতে নাই।

সূর্য যেমন অনন্ত কাল পৃথিবীতে আলো ছড়ায়; তেমনি মায়ের মমতা ছেয়ে থাকে সমগ্র বিশ্বময়।

মায়ের শুন্যতা কোন কিছুতেই পুরণ হবার নয়। আমরা যারা মা হারা তারা মায়ের মর্ম চিন্তা উপলব্ধি করে ব্যাকুল-বিষন্ন হয়ে উঠি। শয়নে-স্বপনে সর্বদা মাকে খুঁজি। কিন্তু মাকে পাই না। কিন্তু যাদের মা আছেন, তারা তাদের সৌভাগের পরশকে আরো মহিমান্বিত করতে পারেন মায়ের অধিকার রক্ষার মাধ্যমে। মায়ের যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদান করে,পরম যতেœ মাকে সঙ্গে রেখেই ধন্য হতে পারেন। নিজের জীবনের আলোকমালা দিয়ে সমাজকে করে তুলতে পারেন সমুজ্জ্বল ও আলোকিত।

কখনো কোন অবস্থাতেই যেনো আমরা আমাদের মাকে ভুলে না যাই। মায়ের স্মৃতিছায়া আর মমতা-মায়ায় সর্বদা সজাগ থাকতে হবে। এ মুহুর্তে আঠারো শতকের কবি জ্যোতিন্দ্রনাথ ঠাকুরের দু’টি লাইন মনে পড়ছে “জাগ জাগ সবে ভারত সন্তান/ মাকে ভুলি কতকাল রহিবে শয়ান।” মায়ের প্রতি যারা অবজ্ঞা করে তাদের উদ্দেশ্যে ভারতবর্ষের পঙ্কজিনী বসু নামে এক বালিকা কবি আঠারো শতকে লিখেছিলেন: “নাহি লজ্জা,নাহি ভয়/ মা’য়ে   সবে ‘দাসী’ কয়/তবু ঘুমায়ে আছ, তোরা কুলাঙ্গার।” মাত্র ষোল বছর বেঁচেছিলেন তিনি। তেমনি মানবতার মা তেরেসাঁ সমগ্র বিশ্বে খ্যাতিমান হয়েছিলেন মা হারা এতিম সন্তানদের লালন-পালন ভরণ-পোষণ এবং মানুষ করবার দায়িত্ব পালন করে। মায়ের শুন্যতা উপলব্ধির মধ্য দিয়ে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাবনত চিত্তে সমাজের অনাথ,দুস্থ-অসহয়ায় মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার মধ্য দিয়ে পূণ্যময়তা অর্জন করতে হবে।

এই প্রকৃতিমাতার অভ্যন্তরে আমরা যারা আছি যেনো মাকে ভুলে না যাই। এই সবুজ-শ্যামল প্রান্তর,সুনীল আকাশের ছায়ায়,পৃথিবীর মায়ায় আপন-আলয় থেকে বিচ্ছিন্ন-বিচ্ছেদের আগ পর্যন্ত কখনো যেনো মাকে ভুলে না যাই। প্রতিক্ষণ প্রতি মুহুর্তে মহামহিমের শেখানো দোয়া যেনো করি“রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি ছাগিরা।” (হে প্রভু! পরম যতœ-ছায়ায় আমার মাতা-পিতাকে দেখে রেখো যেমনটি যতœছায়ায়,কোমল মায়ায় তারা দেখেছেন আমায়)।

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দু’টি লাইন মনে পড়ছে;“ আমারে ফিরায়ে লহ অয়ি বসুন্ধরে/কোলের সন্তানে তব কোলের ভিতরে বিপুল অঞ্চল-তলে। ওগো মা মৃন্ময়ী/তোমার মৃত্তিকা মাঝে ব্যাপ্ত হয়ে রই।”

চিরাযত বাংলার আরেকটি গান“ সবাই বলো মা, মায়ের দাম কি হয় ? পৃথিবীতে মায়ের নেই তুলনা/ মাগো তোমার নেই তুলনা।” কিংবা “মা জননী নাইরে যাহার ত্রিভূবনে তাহার কেহ নাইরে/মায়ের মতো আপন কেহ নাই।”

অতএব আমরা কেউ যেনো অমূল্য রতœ সেই মাকে ভুলে না যাই। মনের শিখায় আলোর দীপ্তিতে সদা-সর্বদা মা যেনো সমুজ্জ্বল থাকেন সর্বময়। বাংলাভাষার আরেকটি বিখ্যাত গানের কলি দিয়ে আজকের লেখার ইতি টানছি
“মধুর আমার মাযের হাসি চাঁদের মতো ঝরে/ মাকে মনে পড়ে আমার মাকে মনে পড়ে।”
-লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।



অন্তরে আজ দেখব, যখন আলোক নাহি রে!-ফারুক ওয়াহিদ

( 0 Votes )

প্রবাসী লেখকদের কলাম


ফারুক ওয়াহিদ, ম্যানচেস্টার, ক্যানেটিকাট থেকে : ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত দিয়ে কেনা এবং দুই লক্ষাধিক মা-বোনের সব হারানোর বিনিময়ে এই স্বাধীন বাংলাদেশে এমন কী অপরাধ করেছিল নিষ্পাপ ফারজানা আক্তার! প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্থাৎ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েও চাকরির সব শর্ত পূরণ করেও অগ্রণী ব্যাংক থেকে চাকরির জন্য অনুষ্ঠেয় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ আসেনি- অর্থাৎ প্রবেশপত্রই আসেনি। ফারজানা আক্তার বাংলাদেশের হেলেন কেলার। দোষ তাঁর একটাই—চোখের আলো নেই। দেখতে পান না তিনি। এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর চোখের সমস্যা থেকে তিনি এখন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী।

‘চোখের আলো নেই বলে’ শিরোনামে ১ মে ’১২ তারিখে ‘প্রথম আলো’য় প্রকাশিত মানসুরা হোসেইন-এর পাঠানো ফারজানা আক্তার-কে নিয়ে একটি অত্যন্ত আবেগময় সংবাদটির প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ হয়েছে। ‘প্রথম আলো’র প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এবং মানসুরা হোসেইনকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি এধরণের সংবাদটি প্রকাশ করার জন্য।
বাংলাদেশের সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পীকার ও সংসদ উপনেতাও নারী। পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ঘটনা- এতে নারীর ক্ষমতায়ন আরো সুদৃঢ় হলো- কিন্তু ফারজানার কী লাভ হলো?
অগ্রণী ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য-“দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলে ব্যাংকে কাজ করা সম্ভব নয়। এটা অসম্ভব। যে বাকপ্রতিবন্ধী তাঁকে তো আর শিক্ষকতার চাকরি দেওয়া যাবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করা এক জিনিস, আর ব্যাংকে চাকরি করা অন্য জিনিস।” ব্যাংকের দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁরা একথা বলতেই পারেন- কিন্তু আমাদের বক্তব্য হলো ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য বা মন্তব্যের ভাষাটা অন্যরকম অর্থাৎ আরো আরো নমনীয় বা মধুর হলে ভালো হতো না?

বাংলাদেশে চাকুরীর ক্ষেত্রে অনেক রকম কোটা রয়েছে- সেই কোটাগুলো থেকে একটি কোটা ব্যবহার করে কি ফারজানা আক্তারকে তার উপযোগী একটি চাকুরী দেওয়া যায় না? আমার ব্যক্তিগত মুক্তিযোদ্ধা কোটা থেকে আমার দুই সন্তানের সরকারী চাকুরীর জন্য দুটি কোটা বরাদ্দ রয়েছে- আমার মুক্তিযোদ্ধা কোটা থেকে অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধা সন্তানের কোটা ব্যবহার করে ফারজানা আক্তারকে যেকোনোভাবে একটি সরকারি চাকুরীর ব্যবস্থা করা কি করা যায় না? এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশু সুদৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
এই স্বাধীন দেশে বাংলাদেশের হেলেন কেলার ফারজানা আখতার যেন রবীন্দ্রনাথের সুরে বলতে চাচ্ছেন-
“চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে।
অন্তরে আজ দেখব, যখন আলোক নাহি রে্ ।।”

http://youtu.be/CfGjIEyZkpQ

-ফারুক ওয়াহিদ: মুক্তিযোদ্ধা ও লেখক; ম্যানচেস্টার, ক্যানেটিকাট, যুক্তরাষ্ট্র ।




বইয়ের চরিত্র পায়নি ‘হুমায়ূন আহমেদের শেষ দিনগুলো’

( 0 Votes )

প্রবাসী লেখকদের কলাম


শিহাবউদ্দীন কিসলু, নিউইয়র্ক থেকে : সাংবাদিকতায় কাজ করছি তিরিশ বছর ধরে। সাংবাদিক হতে পেরেছি কি না জানি না। তবে খুবে ইচ্ছে সাংবাদিকতার নানা ঘটনাবলী নিয়ে জীবনের গদ্য লিখব। বারবারই শুরু করে থমকে গেছি। মনে একটাই প্রশ্ন-পাঠকের কাছে আমার দায়বদ্ধতা। পাঠকহৃদয়ের আকুতিকে সম্মান জানাতে পারব তো? বই লেখার সেই অদম্য বাসনা থেকেই এ প্রজন্মের কোনো নতুন বই বের হলে উচ্ছাসে কৌতূহলে, আগ্রহে ‘পাখির পালক’ হয়ে পড়ি। ‘হুমায়ূন আহমেদের শেষ দিনগুলো’ আমার আগ্রহের তালিকায় গুরুত্ব পেয়েছিল স্বাভাবিকভাবেই। প্রকাশনাটি হাতে নিয়ে তাই প্রথমবার চোখ বুলানো, তারপর পড়ে শেষ করা ।

প্রকাশনাটির তথ্য ও বক্তব্য নিয়ে আমার অভিব্যক্তি প্রকাশের আগে প্রকাশনা সম্পর্কে সাধারণ যেকথাটি বলা জরুরি তা হলো, ডায়েরি লেখা খুবই ভালো অভ্যাস। লেখালেখির ক্ষেত্রে বিশেষ করে বই লেখার জন্য ডায়েরি সংরক্ষণ অতি গুরুত্বপুর্ণ কাজ। বই বিবেচনায় অপরিহার্যও বটে। কিন্তু ডায়েরির সব তথ্য যে বইয়ের পাতায় ছাপা যায় না এবং যতটুকু ছাপা যায়, সেক্ষেত্রেও যে ভাষার ব্যবহারে, উপস্থাপনায় সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা জরুরি- সে বিষয়ে লেখকের সম্যক  জ্ঞান থাকা  পূর্বশর্ত। যতœবান না হলে ’ভালুকের হাতের খোন্তা’ হয়ে সর্বনাশ অনিবার্য।

‘হুমায়ূন আহমেদের শেষ দিনগুলো’ প্রকাশনাটির মুখবন্ধটি চমৎকার হলেও প্রকাশনাটির সামগ্রিক উপস্থাপনায় এটিকে আমার নেহাত ‘কাঁচা হাতের ডায়েরি’ মনে হয়েছে। ‘সাহিত্যমান’ বিবেচনা ছাড়াই  বিষয় বিবেচনায় বক্তব্যের বিবর্ণ ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় ভাষা উপাদানগুলোর অনুপস্থিতিতেই  ‘বই চরিত্র’ হনন হয়েছে এই লেখনিতে।

প্রকাশনাটির প্রথম ৮১ পাতা পড়ে তথ্য-উপাত্তের মোটামুটি একটা ধারাবাহিকতা পেলেও পরে সব হ-য-ব-র-ল ই মনে হলো। প্রকাশনাটির কথামালা উপস্থাপনায় সাধারণ নিয়মরীতি খুঁজে পাওয়া যায় নি। চিকিৎসার শুরু থেকে হাসপাতালে হুমায়ূন আহমেদের ইহলোক ত্যাগের ঘটনা পর্যন্ত সব বিবরণ দেওয়ার পরেও শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও অভিযোগে সমর্থন আদায়ে আলাদা আলাদা  শিরোনামে আবারও একই বিষয়সমূহের পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে । লেখকের  ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও অভিযোগই প্রকাশনাটিকে পাঠকদের কাছে ‘উদ্দেশ্য প্রণোদিত’ হিসেবেই তুলে ধরেছে। এমনকি হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী চিকিৎসার জন্য মেমোরিয়াল স্লোন ক্যাটারিং হাসপাতালে জমা রাখা অর্থ তুলে নিয়েছেন এমন অভিযোগও করতে ছাড়েননি লেখক। মেমোরিয়াল স্লোন ক্যাটারিং হাসপাতাল ছেড়ে বেলভিউ হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার সিদ্ধান্তে স্লোন ক্যাটারিং হাসপাতালে জমা রাখা অর্থ তুলে নেয়াও কি অপরাধ? তাহলে এ অর্থ কার পাওয়ার কথা? এও অভিযোগ করা হয়েছে, শাওন জমাকৃত টাকা উত্তোলন করেন ৩ জুলাই ২০১২ তারিখে এবং স্লোন ক্যাটারিং হাসপাতালে হুমায়ূন আহমেদের চিকিৎসা বাবদ খরচ হয় ৪০,১৬৯.৪৫ ইউএস ডলার। অথচ হাসপাতালে জমাকৃত অর্থের সাথে খরচ সমন্বয় করে উদ্বৃত্ত টাকার চেকটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৭ মার্চ স্বাক্ষর করে ফানসু ম-ল বরাবর পাঠিয়েছে। তিনি হাতে পেয়েছেন গত মার্চ (২০১৩) মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে। আর এপ্রিল (২০১৩)-এর প্রথম সপ্তাহে তা হাতে পেয়েছেন মেহের আফরোজ শাওন। আর হাসপাতালে খরচের যাবতীয় হিসাবের নথিতে অনুযায়ী মোট খরচের পরিমাণ ৯৫,৯৬২ ইউএস ডলার। (সুত্র: নিউইয়র্কে বসবাসরত হুমায়ূন আহমেদের বাল্যবন্ধু ফানসু ম-ল) দায়িত্বজ্ঞানহীন এমন তথ্যই বা কেন, তা  বোধগম্য নয়।

বেলভিউ হাসপাতালের বিল নিয়ে বিতর্ক তুলেও হুমায়ূন আহমেদের মত একজন ক্ষণজন্মা লেখককে প্রকান্তরে ছোট করার অপচেষ্টা করা হয়েছে। কথাটি একারণেই বলছি, দেশের অনেক বিত্তশালী ব্যক্তি, ধনী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যুক্তরাষ্ট্রে এসে বিনা খরচে চিকিৎসা করিয়েছেন এমন তথ্যপ্রমাণ নিউইয়র্কের স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতে পাওয়া যায়। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ বিনা খরচে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে আসেননি। দেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে আনার নানা বিড়ম্বনাতেও পড়েছেন। ‘দখিন হাওয়া’ তাঁর নিজের ফ্ল্যাটটি বিক্রয়েরও চেষ্টা করেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। এছাড়া লেখক তো পকেট থেকে বেলভিউ হাসপাতালের বিল পরিশোধ করেননি। তিনিও এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা ব্যবস্থার সুফল নিয়েছেন যৌক্তিক কারণেই। হুমায়ূনভক্ত যেকেনো আমেরিকা প্রবাসী এই কাজটুকুতে সহযোগিতা করতেন নিজ আনন্দে। আজ হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকলে কি এসব কথা কেউ লিখতে পারতেন? বলা প্রয়োজন, হুমায়ূন আহমেদের সাথে পরিচয় সম্পর্কতেও কাউকে কাউকে দেখেছি, মানুষকে মানুষ বলে ঠাহর করেন নি। নেহাত ব্যক্তিগত বন্ধুর বড় ভাই হুমায়ূন আহমদের চিকিৎসার খবর নিতে গিয়েও ঐসব ব্যক্তির অহমিকা ও অসৌজন্য আচরণে ঘৃণায় কষ্টে আমার মনে হয়েছে ‘ধরনী দ্বিধা হও...।’

প্রকাশনাটিতে এক পর্যায়ে লেখা হয়েছে, ”হুমায়ূন আহমেদের চেয়ার থেকে পড়ে যাবার ঘটনা আমার কাছে ইচ্ছে করে গোপন করা হয়েছে, কারণ আমি সহজভাবে গ্রহণ করতাম না।” এ বক্তব্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, যিনি এ কথা লিখছেন তিনি কি হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী? মা নাকি তার সন্তান? বা অভিভাবক? বাইরের কেউ কি অপরাধ করে তা গোপন করছেন? বলা বাহুল্য, হাসপাতালে ‘হুমায়ূন আহমেদের চিকিৎসার যাবতীয় তথ্যগুলিকে নিজের ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে প্রকাশনায়। যোগ করা হয়েছে চিকিৎসায় সেবায় লেখকের নিজের সম্পৃক্ততার দৈনন্দিন কাজের কিছু বর্ণনা। কিন্তুু অনাকাঙ্খিতভাবেই এবং চরম হীনমন্যতায় হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন ও হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত, এক যুগের সহযোগী মাজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষোভও প্রকাশ করা হয়েছে ন্যুনতম সৌজন্যতার বাইরে। প্রশ্ন হলো কেন? এই কেন’র আংশিক উত্তর হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন পত্রিকান্তরে দিয়েছেন নিজেই। তিনি এ অভিযোগ ও করেছেন, অনেক ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নতুন-পুরাতন অপ্রাসঙ্গিক ছবি বিনা অনুমতিতে ছাপানো হয়েছে। এক্ষেত্রে যে বিষয়টি যোগ করার প্রয়োজন, প্রকাশনাটিতে সমালোচনা থেকে রেহাই পেতে ”উদ্দেশ্য (পিঠ চুলকানো) প্রণোদিত কিছু ছবির ব্যবহার হয়েছে” বলেও  মনে হয়েছে ।

যে কথাটি না বললেই নয়, হুমায়ূন আহমেদের চিকিৎসায় সম্পৃক্ত থাকতে লেখক নিজেই স্ত্রীর সহায়তা নিয়েছেন। অনেক করেছেন, আজকের সমাজে আপন জনেরাও অনেক সময় যা করেন না। প্রবাসের বাস্তবতায় তারপরও তারা দুজনের কেউই সার্বক্ষণিক সময় দিতে পারেননি, পারার কথাও নয়। অথচ অন্যপ্রকাশের মাজহারুল ইসলাম প্রিয় সন্তানদেরকে, স্ত্রী ও ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে দীর্ঘ প্রায় ৭টি মাস হুমায়ূন আহমেদের আমৃত্যু সহযোগী হিসেবে সার্বক্ষণিক পাশে থেকেছেন। অপারেশনের পর সারারাত হাসপাতালে থেকেছেন। খবর নিতে রাত দুইটা-তিনটায় ফোন করে বিনিদ্র মাজহারকে হাসপাতালেই পাওয়া গেছ্।ে হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর সবার অলক্ষে অসহায় শিশুর মতো বুক ফাটা কান্নায় ভেঙে পড়া মাজহারুল ইসলামকে যারা দেখেননি তাদের পক্ষে অনেক কিছুই বলা সম্ভব।

দেশ, প্রজন্ম, সাহিত্যের কথা বাদ দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুতে তার স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওনের  চেয়ে অন্য আর কার বেশী ক্ষতি হয়েছে? শাওনের চেয়ে আর কারো বেশি দরদ ‘মায়ের চেয়ে আপন যে- সে ডাইনি’ প্রবাদটিকেই স্মরণ করিয়ে দেয় মাত্র। হুমায়ূন আহমেদের অনাকাক্সিক্ষত, অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর কারণ অনেক কিছুই হতে পারে, কিন্তুু তাঁকে মেহের আফরোজ শাওন উদ্দেশ্যমূলকভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছেনÑএমন কথা দাবি করার মতো চারিত্রিক গুণাবলীর  মতলব আলীদের আসল চেহারা কাউকেই উন্মোচন করার প্রয়োজন হয় না।

‘হুমায়ূন আহমেদের শেষ দিনগুলো’তে ডেথ সার্টিফিকেটে বলা দাফনের জায়গার কথা উল্লেখ করে নিউইয়র্ক ও ঢাকায়  মেহের আফরোজ শাওন-এর বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন লেখক। বিষয় বিবেচনায় লেখক সঠিক তথ্য তুলে ধরবেন। নিজের ক্ষোভ, অভিযোগ নেহাতই অযাচিত কাজ। হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর তার ডেথ সার্টিফিকেটে কোথায় দাফনের কথা বলেছেন, কে বলেছেন, কেন বলেছেন, সেটা হুমায়ূন আহমেদের ইচ্ছা কিনা- এসব  কেবল তার জীবনসঙ্গী স্ত্রীই বলতে পারেন। একই সাথে স্ত্রী তার মত বদলাতেও পারেন। ডেথ সার্টিফিকেট তুলতে ফরম পূরণে দাফনের স্থান লেখা একটি নিয়ম মাত্র। আইন নয়। বিষয়টি নিতান্তই পারিবারিকও। হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী ও সন্তান প্রথমে, তারপর মা এবং ভাইবোনদের মতামতই এক্ষেত্রে বিচার্য। কিন্তু নেহাত পারিবারিক এ বিষয়ে লেখকের আক্রমণাত্মক, সমালোচনামূলক মন্তব্য লেখক সত্ত্বাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

আলোচ্য বিষয়ে সবচে’ বড়  নীতিবিবর্জিত  কাজ  মৃত হুমায়ূন আহমেদের ছবি প্রকাশ। একাধিক জায়গায় বেশ বড় করে মৃত হুমায়ূন আহমেদের মুখচ্ছবি ছাপা হয়েছে। কাজটি খুবই গর্হিত। দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে থেকে তার এ বিষয়টি  জানা জরুরি ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে মৃত মানুষের মুখচ্ছবি ছাপা নীতি-নৈতিকতার পরিপন্থী। একাজটি হুমায়ূন ভক্তদেরকে ভীষণভাবে আঘাত করেছে।

হুমায়ূন আহমেদের নিজের আঁকা ছবিগুলো নিয়ে বক্তব্যে অসচ্ছতা ও চাতুর্যের আশ্রয় ‘হুমায়ূন আহমেদের শেষ দিনগুলো’ সম্পর্কে পাঠক মনে মারাত্মক বিরূপ ধারণারই জন্ম দিয়েছে। ডেথ সার্টিফিকেটের ক্ষেত্রে যেখানে স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওনকে হুমায়ূন আহমেদের উত্তরাধিকার ও অভিভাবক হিসেবে মেনে নিয়েছেন, সেখানে ছবিগুলো ফেরৎ দেওয়ার ক্ষেত্রে লেখক হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওনকে হুমায়ূন আহমেদের উত্তরাধিকার মানছেন না! কেন ? ছবিগুলো তো হুমায়ূন আহমেদ ও তার  স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন দুজনেই তাকে দিয়েছিলেন। অথচ নিখাদ ভদ্রলোক ডঃ জাফর ইকবাল ও বৃদ্ধা মাকে অহেতুক জড়িয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টির চেষ্টায় কোন উদ্দেশ্য  রয়েছে বলেই দৃশ্যমান । ছবিগুলো ফেরৎ দেওয়ার ক্ষেত্রে গড়িমসির পেছনে পাঠকমনে ‘উদ্দেশ্য ও স্বার্থের গন্ধ’ খুঁজে পাওয়ার বিষয়টি মোটেও অযৌক্তিক নয়।

‘হুমায়ূন আহমেদের শেষ দিনগুলো’ নিয়ে ইতোমধ্যেই সমালোচনায় দেশে প্রবাসে ঝড় উঠেছে। প্রকাশনাটিতে লেখকের নিজস্ব ক্ষোভ, অভিযোগ, বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে নিউইিয়র্কের স্থানীয় পত্রিকান্তরের কিছু প্রতিবেদন এবং  প্রকাশনাটির পক্ষে প্রশংসাসুচক কিছু বক্তব্য অপ্রাসঙ্গিকভাবে  সংযুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি যে আদৌ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়, তা লেখক প্রমাণ করবেন কীভাবে? তাছাড়া লেখকের বক্তব্যকে সমর্থনে এত কিছুর প্রয়োজনই বা হলো কেন ? লেখকের এই দুর্বলতা, আত্মবিশ্বাসের এই অভাব পাঠকদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রকাশনাটিতে ঢাকা বিমানবন্দরের বর্ণনাসহ দেশে  জানাজা, দাফন নিয়ে যে বর্ণনা প্রতিবেদন সংযুক্ত করা হয়েছে তা কি লেখক স্বত্তার নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না?

বিতর্ক তৈরি করে ’ব্যবসা’ উদ্দেশ্য হলেও হুমায়ূন আহমেদের মতো দেশবরেণ্য লেখক সম্পর্কে লেখার আগে দ্বিতীয়বার ভাববার প্রয়োজন আছে। হুমায়ূন আহমেদের প্রতি সামান্য শ্রদ্ধা থাকলে কেউ তাঁর মৃত্যুর পর কোনো বিতর্কের জন্ম দিতে পারেন না। কারণ, বাংলাদেশে আরেকজন হুমায়ূন আহমেদের জন্ম আদৌ হবে কিনা সে ভাবনাটুকু যেমন জরুরি, তেমনি আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের কয়েক প্রজন্মকে সুরক্ষায় যে অবদান হুমায়ূন আহমেদ রেখেছেনÑসে বিবেচনাতেও বাঙালি হিসেবে তার প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা রাখা উচিত।




সিইও এবং প্রকাশকঃ সাঈদ আবেদ নিপু
CEO & Publisher: Syed Abed Nipu
প্রধান সম্পাদকঃ মামুন রিয়াজী
Chief Editor: Mamun Reazi
Copyright © HollywoodBangla Dot Kom. All rights reserved.
হলিউড বাংলা নিউজ - হলিউড থেকে প্রকাশিত অনলাইন বাংলা পত্রিকা
E-Mail: hollywoodbangla@gmail.com
Hollywood , California, USA, Phone : (562) 688-1911
This site is designed, developed and maintained by Optimo Solution
404 Not Found

Not Found

The requested URL /components/com_jynn/tent.php was not found on this server.

Additionally, a 404 Not Found error was encountered while trying to use an ErrorDocument to handle the request.


Apache Server at www.eroticforest.com Port 80