অন্যান্য খবর
নিউইয়র্ক: সোহাগ উদ্দিন সাদের মতো একজন জনপ্রিয় নেতাকে হারিয়ে শোকে ম্যুহমান যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি কমিউনিটি। সবার মুখেই একই কথা, এমন একটি ভালো মানুষের এমনভাবে চলে যাওয়া মেনে নেওয়া যায় না। রোববার ব্রুকলিনে সাদ উদ্দিনের নামাজে জানাজায় উপস্থিত ছিলেন কয়েক হাজার বাংলাদেশি। সবারই মুখ মলিন, কারো কারো চোখে পানি। সাদ উদ্দিনকে এভাবে বিদায় দিতে হবে কেউ যেনো সেটা বিশ্বাস করতে পারছেন না।
নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কমিউনিটির জনপ্রিয় নেতা সোহাদ উদ্দিন সাদ নিখোঁজ হওয়ার ১০ দিন পর তার মৃত্যুর খবরটি আসে। সাদ উদ্দিন গত ৭ মে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন বলেই তার মেডিকেল রিপোর্টে জানানো হয়েছে। সাদ উদ্দিনের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় সানোয়ার চৌধুরী জানিয়েছেন শুক্রবার দুপুরের দিকে তারা খবরটি জানতে পারেন। পুলিশ তাদেরকে জানায় অ্যাস্টোরিয়ার ৩০ এভিনিউতে মাউন্ট সিনাই হাসপাতালের মর্গে সাদ উদ্দিনের মরদেহ রয়েছে । দ্রুত সেখানে গিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত হন আত্মীয় স্বজন ও কমিউনিটির নেতারা। বিকেলের দিকে মরদেহ নিয়ে যান বলে জানান সানোয়ার চৌধুরী।
তিনি জানান, পুলিশ ও হাসপাতালের ভাষ্যমতে, ৭ মে দুপুরেই সাদ উদ্দিনকে মৃত অবস্থায় ৩০ এভিনিউর সাইডওয়েতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এসময় পথচারী কেউ দেখে দ্রুত হাসপাতালে খবর দিয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্স এসে তার মরদেহ নিকটবর্তী মাউন্ট সিনাই হাসাপাতালে নিয়ে যায়। এসময় সাদ উদ্দিনের পকেটে কোনো আইডি কার্ড বা অন্য কোনো কাগজপত্র না থাকায় ওই বিকেলেই অজ্ঞাত পরিচয় হিসেবে মর্গে পাঠিয়ে দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
পুলিশের বরাত দিয়ে সানোয়ার চৌধুরী আরও জানান, হাসপাতাল বিষয়টি পুলিশকে হস্তান্তর করলে পুলিশ এফবিআইকে জানায়। এফবিআই তার হাতের ছাপসহ অন্যান্য চিহ্ন দিয়ে তার পরিচয় বের করে আত্মীয়দের কাছে জানায়। এরই মধ্যে কেটে যায় ১০ দিন।
সানোয়ার বলেন, বিষয়টি সম্পূর্ণ মেডিকেল কেস বলেই আমরা নিশ্চিত হয়েছি। এর আগে বিভিন্ন ধরনের সন্দেহ করা হয়েছিলো সেগুলো সবই ভুল বলেও জানান তিনি।
রোববার বাদ জোহর ব্রুকলিনের আল-আমান মসজিদে সাদ উদ্দিনের নামাজে জানাজা আদায় করা হয়। সেখানে হাজির হয়েছিলেন কমিনিটির নেতারা। ছিলেন কমিউনিটির হাজার হাজার মানুষ। সেখানে কথা হয় নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি কামাল আহমেদের সঙ্গে। ভাঙ্গা কণ্ঠে তিনি বলেন, এমন একটি মানুষ হয় না। সবার জন্যই তিনি বাড়িয়ে দিতেন সেবার হাত। সাদ উদ্দিনের মৃত্যু কমিউনিটির বড় ক্ষতি।
কথা হচ্ছিলো যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নজমুল ইসলাম বলেন, সাদ উদ্দিনের মৃত্যুতে কমিউনিটির যে ক্ষতি হলো তা পূরণ হবার নয়। তিনি কমিউনিটির জন্য যা করতেন তেমন করে আর কাউকে করতে দেখি না।
জালালাবাদ সমিতির সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী তানউইর আহমেদ লোবান বলেন, জালালাবাদ সমিতির সবশেষ নির্বাচনে সহসভাপতির প্রার্থী ছিলেন সাদ উদ্দিন। যেদিন থেকে তাকে পাওয়া যাচ্ছিলো না তার আগের দিনও মিটিংয়ে তিনি জালালাবাদ সমিতির ভবিষ্যত কি হবে তা নিয়ে তার স্বপ্নের কথা বলেছিলেন। আমরা একজন প্রিয় মানুষকে হারালাম।
জালালাবাদ সমিতির আসন্ন নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্বপ্রাপ্ত আতাউর রহমান সেলিম বলেন, সাদ ভাই কতটা জনপ্রিয় মানুষ ছিলেন তা তার এই জানাজায় হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি থেকেই নিশ্চিত হওয়া যায়।
কমিউনিটির নেতা সৈয়দ ইলিয়াস খসরু বলেন, কমিউনিটির সবার প্রতি সাদ উদ্দিনের ছিলো সমান দৃষ্টি। কারো কোনো বিপদে, প্রয়োজনে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়তেন। সাদ উদ্দিনের কাছ থেকে সহয়োগিতা পাননি এমন কেউ নেই।
এমন একটি মানুষ যিনি সবাইকে সহায়তা করতেন অত্যন্ত অসহায়ভাবে তিনি রাস্তার মাঝে পড়ে থেকে মৃত্যুবরণ করলেন, তার লাশ বেওয়ারিশ হিসাবে ১০ দিন পড়ে থাকলো হাসপাতালের মর্গে সে কথা যেনো মানতেই পারছি না, কান্নাজড়িত কণ্ঠে সে কথা বললেন বিয়ানিবাজার সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুর রাজ্জাক।
১০ দিন হিমাগারে সাদ উদ্দিনের মরদেহ পড়ে থাকার বিষয়টি মেনে নিতে পারছেনই না যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবদুর রহমান। তিনি বলেন, এটি কমিউনিটির ব্যর্থতা। তবে সাদ উদ্দিনের পরিচয়পত্র ও অন্য নথিপত্র না পাওয়ার বিষয়টি নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন আবদুর রহমান।
রাতেই সাদ উদ্দিনের মরদেহ দেশের উদ্দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কুয়েত এয়ারওয়েজে করে তার দুই আত্মীয় মরদেহ নিয়ে দেশের উদ্দেশে রওয়ানা দেন। সিলেটের গোলাপগঞ্জে সাদ উদ্দিনের বাড়ি। সেখানে রয়েছেন তার স্ত্রী ও দুই ছেলে।
নিউইয়র্কে ট্যাক্সি চালাতেন সাদ উদ্দিন। গত ৭ মে মঙ্গলবার বেলা সোয়া একটার দিকে নিউইয়র্কের অ্যাস্টোরিয়ায় ৩০ এভিনিউয়ের ৪২-৩৮ নম্বরের কাছে তার ট্যাক্সিটি পরিত্যাক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। ৭৫ প্রিসিঙ্কট এর পুলিশ বিষয়টি জানতে পারে। ট্যাক্সিটি উদ্ধার করা হলেও তখন থেকেই আর পাওয়া যাচ্ছিলো না সাদ উদ্দিনকে। ট্যাক্সির মিটারের তথ্য অনুযায়ী বেলা ১টা ০৫ মিনিটে তিনি ওই স্থানে গাড়িটি পার্ক করেন। এর আগে ১২ টা ২০ মিনিটে ওজন পার্ক’র ১০৫, ৮৬ ক্রস বে ব্লুবার্ড থেকে ট্যাক্সি নিয়ে রওয়ানা দেন। এই ওজন পার্কেই বাস করতেন সাদ উদ্দিন।
সোহাগ উদ্দিন সাদ কমিউনিটিতে অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তি ছিলেন। একজন সামাজিক মানুষ হিসেবে তার পরিচিতি ছিলো। গোলাপগঞ্জ সমিতির সভাপতি ছিলেন তিনি। কমিউনিনির এই পরিচিত ব্যক্তিত্ব এবার বৃহত্তর সিলেটের জালালাবাদ সমিতির নির্বাচনে সহসভাপতি পদে নির্বাচন প্রার্থী হয়েছিলেন।
কমিউনিটির নেতারা জানান, সবার উপকারে নিজের হাত বাড়িয়ে দিলেও নিজের স্বার্থে সাদ উদ্দিন ছিলেন একেবারেই অমনোযোগী। দুই দশকের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করলেও তার নিজের স্থায়ী বাসের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারেননি। পাননি গ্রিন কার্ডটিও। আর এ কারণেই দীর্ঘ সময় ধরেই তিনি স্ত্রী-সন্তানদের থেকে দূরে ছিলেন। এত সবার মাঝেও ছিলেন একাকি একটি মানুষ।
তার আত্মীয় সানোয়ার চৌধুরী জানান, শেষ দিকে নিজের কাগজপত্র পাওয়ার জন্য বেশ চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন সাদ উদ্দিন। স্বপ্নছিলো গ্রিনকার্ড পেলে স্ত্রী পরিজনকে নিয়ে আসবেন এই দেশে। নিজেও যাবেন দেশের বাড়িতে প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে দেখা করতে। সাদ উদ্দিনের সেই স্বপ্ন পূরণ হলো না। কফিন বন্দি হয়ে তিনি দেশে ফিরলেন রোববার রাতে।