ঢাবি ক্যাম্পাসে চুরি ছিনতাই বেড়েই চলছে
অন্যান্য খবর
সোমবার, 16 জুলাই 2012 01:20
ইয়ামিন সাজেদ : ঢাকা থেকে : চুরি, ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েই চলছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে। ছিনতাইকারীরা এতটাই বেপরোয়া, দিনদুপুরে ঘটাচ্ছে এসব ঘটনা। জানা যায়, গত তিন মাসে এ এলাকা থেকে ডজন খানেক প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল ও ল্যাপটপ ছিনতাই হয়েছে। ক্যাম্পাসের কিছু কিছু এলাকা দিনের আলোতেও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থী ও পথচারিদের কাছে। নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে মুক্ত বুদ্ধি ও সংস্কৃতি চর্চার এ অঙ্গন। এদিকে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এসব ঘটনার সঙ্গে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্রনেতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা জড়িত থাকায় প্রতিকারের উদ্যোগ নিতে পারছেন না তারা।
ঢাবি প্রক্টর অফিস ও শাহবাগ থানা সূত্রে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল ও ল্যাপটপসহ কয়েক ডজন চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গত এপ্রিল, মে ও জুন মাসে এর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২টিতে। নির্দিষ্ট স্থান ও নির্দিষ্ট সময়ে ছিনতাইকারীরা এসব ঘটনা ঘটিয়ে থাকে বলে জানা যায়। এরই মধ্যে ক্যাম্পাসের ফুলার রোড, টিএসসি দোয়েল চত্বর ও ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগ ছিনতাই স্পট হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। আর সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত সময়টি ছিনতাইয়ের পিক আওয়ার এসব চোরের কাছে। এ সময়ে ওই স্থানে ছিনতাইকারীদের একটি সংঘবদ্ধ চক্র ওতপেতে থাকে। সুযোগ বুঝে প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল নিয়ে উধাও হয়ে যায় তারা। এছাড়া ল্যাপটপ ছিনতাইয়ে একটি কৌশল অবলম্বন করে এসব ছিনতাইকারী। পেছন থেকে মোটরসাইকেলে এসে কাঁধে থাকা ব্যাগ টেনে নিয়ে যায় এ চক্রটি।
জানা যায়, গত ২০ জুন দুপুর ১টায় কলাভবনের পশ্চিম ফটকে গাড়ি রেখে ক্লাস নিতে যান ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান। এক ঘণ্টা পর এসে আর গাড়ি খুঁজে পাননি তিনি। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ১৫ লাখ টাকার গাড়ি চুরি হয়ে যায়। তার গাড়ির নম্বর ঢাকা মেট্রো-গ, ১৪-৫৬৪৯। সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন দিকে খোঁজ নিলেও গাড়ির আর হদিস পাওয়া যায়নি। তিনি বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় ভিসি, প্রো-ভিসি ও প্রক্টরকে জানান। শাহবাগ থানায় একটি মামলাও করেন। মামলা নম্বর ২২। একই তারিখে দোয়েল চত্বর থেকে রাত ৮টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের ল্যাপটপটি নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। কার্জন হল থেকে হলে ফেরার পথে তিনি ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন তিনি। এ ঘটনায় তিনি শাহবাগ থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের নামে একটি মামলাও দায়ের করেন।
এর একমাস আগে ২৫ মে শিশু একাডেমীর মূল গেট থেকে আরেকটি ল্যাপটপ ছিনতাই হয়ে যায়। ওই দিন সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের মাস্টার্সের এক ছাত্র একাডেমী থেকে বের হয়ে দোয়েল চত্বরের মূল রাস্তায় উঠতেই ছিনতাইকারীরা তাকে ঘিরে ধরে। এ সময় ল্যাপটপের সঙ্গে থাকা তার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রও নিয়ে যায় তারা। এর ছয় দিন আগে ১৯ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক মাজহারুল হান্নান প্রাইভেট কার রেখে জুমার নামাজ আদায় করতে যান। নামাজ পড়ে ফিরে এসে দেখেন সেটি আর নেই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শাহবাগ থানায় মামলা করেও তিনি তার গাড়ি ফেরত পাননি। সর্বশেষ এ মাসের ২ তারিখে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান তমালের মোটরসাইকেলটি নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। ওই দিন টিএসসির শান্তির পায়রা স্তম্ভেরে নিচে গাড়ি রেখে বিক্ষোভ মিছিলে যান তিনি। মিছিল শেষ করে এসে আর গাড়ি খুঁজে পাননি।
ঢাবি ক্যাম্পাসে ছিনতাইয়ের ভয় ও দুর্নাম এখন আর রমনা এলাকাতেই সীমাবদ্ধ নেই। জাপানের হিরোশািম বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ছড়িয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবিদ্যা সম্মেলনে যোগ দিতে এসে সর্বস্ব হারিয়েছেন জাপানি অধ্যাপক মাসাহিকো তোয়াগা। ১৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) ক্যাফেটেরিয়ায় দুপুরের খাওয়ার সময় সময় তার ব্যাগটি চুরি হয়ে যায়। ব্যাগে দুই হাজার ডলার, এক লাখ ইয়েন, বাংলাদেশি ৫০ হাজার টাকা, একটি ল্যাপটপ, একটি ডিজিটাল ক্যামেরা, মডেম, কিছু বই ও মূল্যবান কাগজপত্র এবং তার পাসপোর্ট ছিল। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তিনি তার ল্যাপটপ কিংবা ল্যাপটপের হার্ডডিস্কটি অন্তত ফেরত চেয়েছেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও বাংলাদেশী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা ফেরত দিতে পারেনি।
প্রায় প্রতিদিনই কোনো কোনো ব্যক্তি এসব ছিনতাইকারীর কবলে পড়ছে এলাকাটিতে। এসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী ও অতিথিরা যখন দিশেহারা তখন নিতান্তই দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ক্যাম্পাসে এসব ঘটনা বন্ধ করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একটি প্রক্টরিয়াল টিম গঠন করা হলেও তাদের কোনো সফলতা নেই। এছাড়া শাহবাগ থানায় প্রত্যেকটি ঘটনার মামলা করা হলেও তারা একটি জিনিসও উদ্ধার করতে পারেননি। গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, তাদের এ ব্যর্থতার মূল কারণ ছিনতাইকারীদের অনেকেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্রনেতা। ফলে তারা সব কিছু জেনেও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছেন না। এদের অধিকাংশ হচ্ছেন কবি জসীমউদদীন, জগন্নাথ, জিয়া ও সূর্যসেন হলের কেন্দ্রীয় ও হল শাখার ছাত্রলীগ নেতাকর্মী। আবার কাউকে গ্রেফতার করা হলে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নেতারা বিভিন্ন সময় সুপারিশ করে তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে যান। এ চক্রটির নেতৃত্বে রয়েছেন জসীমউদদীন হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি ফুয়াদ আলম ও নৃবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র মাহতাব। জানা যায়, গত ১০ এপ্রিল তারা সূর্যসেন হল থেকে একটি মোটরবাইক ছিনতাই করে ওই চক্র। এ ঘটনার দায় চাপানো হয় অন্য ছাত্র সৌরভের ওপর। এছাড়া রাতে ছিনতাইয়ের ঘটনায় টিএসসি ও ভিসি চত্বরে যেসব ছাত্রলীগ নেতা আড্ডা দেন তারা জড়িত রয়েছেন বলে জানা যায়।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ড. আমজাদ আলী বলেন, ছিনতাইয়ের ঘটনাটি প্রকট আকার ধারণ করেছে। কিন্তু আমাদের পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮টি মূল ফটকে নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি সোহাওয়ার্দী উদ্যানের সীমানায় বাউন্ডারি নির্মাণের দাবি জানান।
এ সম্পর্কে শাহবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বাইরের চোর আসার সাহস হয় না। এ এলাকার চুরির সঙ্গে এখানকার ছাত্ররাই জড়িত। বিভিন্ন সময় অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে গ্রেফতার করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতারাই তাদের হয়ে ফোন করেন। তিনি বলেন, আমাদের ফোর্স যেমনভাবে চোরদের পাহারা দেয় চোরের দলও তাদের পাহারা দেয়। ফলে আমরা হাতেনাতে কাউকে ধরতে পারছি না।