Type in:

গার্মেন্ট শ্রমিক অসন্তোষের নেপথ্যে

( 0 Votes )

অন্যান্য খবর


অযৌক্তিক মজুরি-কাঠামো, মালিক-শ্রমিকদের সুসম্পর্কের অভাব, নূ্যনতম সুযোগ-সুবিধা না থাকা, কারখানায় সুস্থ কর্মবান্ধব পরিবেশের অনুপস্থিতি, বিভিন্নভাবে নারীশ্রমিকদের বঞ্চনা এবং তাদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নসহ প্রভৃতি অনভিপ্রেত ঘটনা কাজ করছে বর্তমান শ্রমিক-অসন্তোষের নেপথ্যে। শ্রমিকনেতা ও সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দেশে প্রচলিত কারখানা আইন ও আইএলও কনভেনশন মেনে কারখানা পরিচালনা করতে না পারলে শ্রমিকরা তাদের কাজের জন্য শ্রমবান্ধব পরিবেশ পাবেন না। ফলে শ্রমিক-অসন্তোষ দূর করা কঠিন হয়ে পড়বে। পাশাপাশি শ্রমিক-অসন্তোষ কমিয়ে আনতে প্রয়োজন শ্রম আইন, ২০০৬-এর সংশোধন, যা কি না শুধু মালিকদেরই স্বার্থ সংরক্ষণ করছে।

শ্রমিকনেতা ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মালিকরা দাবি পূরণের নামে শ্রমিকদের চোখে ধুলা দিয়ে যাচ্ছেন। তা না করে তাদের উচিত, সরকার ও শ্রমিকদের নিয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে শ্রমিকদের দাবিদাওয়া পূরণের উদ্যোগ নেওয়া।

বিগত কয়েক বছরে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে গার্মেন্টসে নূ্যনতম মজুরি ধরা হয়েছে তিন হাজার টাকা। এর মধ্যে মূল বেতন দুই হাজার, বাড়িভাড়া ৮০০ ও চিকিৎসা ভাতা ২০০ টাকা। অথচ বর্তমানে যেমন-তেমন একটি ঘরের ভাড়া দুই হাজার টাকার কম নয়। এর বাইরে খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসাসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে এ টাকায় একজন শ্রমিকের জীবনধারণ অসম্ভব। এর পরও শ্রমিকরা জীবনের সঙ্গে একরকম সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। পুষ্টিবিদদের মতে, একজন শ্রমজীবী মানুষের খাদ্যের চাহিদা মেটাতে দৈনিক ৭৫ টাকা প্রয়োজন। এ হিসাবে মাসে প্রয়োজন দুই হাজার ২৫০ টাকা। এর সঙ্গে যদি দুই হাজার টাকা বাসাভাড়া যোগ করা যায়, তবে এ হিসাব দাঁড়ায় চার হাজার ২৫০ টাকায়। ফলে জীবনধারণের জন্য তাকে ওভারটাইম বা অন্য কোনোভাবে ব্যবস্থা করতে হয় আরও এক হাজার ২৫০ টাকা। কিন্তু এ তো শুধু শ্রমিকের একার খরচ। তাদের পরিবারে তো আরও সদস্য আছে। এ ক্ষেত্রে তাদের নাভিশ্বাস কোথায় গিয়ে পেঁৗছেছে ভাবা মুশকিল।

কথা হলো পোশাকশ্রমিক রুনা আক্তারের (২০) সঙ্গে। কষ্টের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, মিরপুরের এনসিয়র এফসিএম লিমিটেড নামের গার্মেন্টসে তার বেতন চার হাজার ২০০ টাকা। ওভারটাইম থেকে আসে প্রায় দেড় হাজার টাকা। রুনা মিরপুরের দুয়ারীপাড়ায় বস্তিতে ছোট্ট একটি ঘরে মা-বাবা ও ভাইদের নিয়ে থাকেন। ভাড়া দুই হাজার টাকা। পরিবারের খাবার খরচ বাবদ ব্যয় হয় পাঁচ হাজার টাকা। এর বাইরে চিকিৎসা, পোশাকসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে তাকে ধারদেনা করে মাস পার করতে হয়। কণ্ঠে দুঃখ ও ক্ষোভ নিয়ে রুনা বলেন, 'বাসাবাড়িতে কাম কইরা সম্মান নাই। তাই কষ্ট কইরা গার্মেন্টসে কাজ করতাছি। কিন্তু এ টাকায় সংসার চলে না। আমাগো পিঠ এহন দেয়ালে ঠেইকা গেছে। মজুরি না বাড়াইলে কেমনে বাঁচমু আল্লাহ জানে।'

গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু বলেন, দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর শ্রমিকদের কিছু দাবি পূরণ করা হয়েছে। তবে অনেক দাবিই এখনো পূরণ হয়নি। আর এ জন্য প্রয়োজন সরকার ও মালিকপক্ষের আন্তরিকতা।

পোশাকশ্রমিকদের সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী এ শিল্পে কাজ করেন ৪০ লাখ শ্রমিক। এর ৭০ শতাংশই আবার নারী। এ নারীশ্রমিকরা নানা কারণে দীর্ঘদিন ধরে লাঞ্ছনা ও নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছেন। পোশাকশিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টির নেপথ্যে এটিও অন্যতম একটি কারণ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। নারীশ্রমিকরা জানান, কাজ করতে গিয়ে তাদের প্রায়ই পুরুষ সহকর্মী ও মালিকপক্ষ কর্তৃক মানসিক, শারীরিক ও যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হয়। এ ছাড়া মাতৃত্বকালীন নির্ধারিত বেতন-ভাতা তো পাচ্ছেনই না, উল্টো নানা অজুহাতে তারা চাকরি হারাচ্ছেন। অথচ আইনে মাতৃত্বকালীন সবেতন ছুটির কথা উল্লেখ আছে। শুধু তা-ই নয়, এমনকি বিশেষ প্রয়োজন বা শারীরিক অসুস্থতার কারণেও তারা ছুটি পান না। পুরুষদের তুলনায় প্রতিবাদী কম হওয়ায় তাদের কাছ থেকে আদায় করা হয় অতিরিক্ত শ্রম। আবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে রাতে কাজ করানো হয়। অথচ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১০৯ ধারামতে, ইচ্ছার বাইরে নারীশ্রমিকদের কোনো প্রতিষ্ঠান রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত কোনো কাজ করাতে পারবে না। এ ছাড়া ওভারটাইমের ক্ষেত্রে তাদের ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করা হয়।

কারখানাগুলো লাভের জন্য শ্রমিকদের দিনরাত শ্রমে বাধ্য করলেও তাদের নূ্যনতম স্বাস্থ্যসুবিধা দেয় না। রাজধানীতে কারখানাগুলোর অধিকাংশই নির্মিত হয়েছে অপরিসর জায়গায়। কারখানায় আলো-বাতাসে যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় বদ্ধ পরিবেশে দীর্ঘক্ষণ কাজ করায় শ্রমিকরা রয়েছেন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। অগি্ননির্বাপণের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন তারা। বহু আন্দোলন-সংগ্রামের পরও মালিকরা শ্রমবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারেননি। শ্রমিক-অসন্তোষের এটিও অন্যতম কারণ।

সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সংগঠনের নেতা ও শ্রমিকরা জানান, দেশের প্রায় সব কারখানায় ২৫০ জনের বেশি শ্রমিক কাজ করেন। কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের জন্য কোনো বিশ্রামাগার নেই। নেই ক্যান্টিন। এ কারণে অনেক শ্রমিক দুপুরের খাবার খেতে কারখানার ছাদে উঠে যান। অথচ ১৯৬৫ সালের কারখানা আইন অনুযায়ী ২৫০ জনের বেশি শ্রমিকের জন্য ক্যান্টিন থাকা বাধ্যতামূলক। শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা-১০০ অনুযায়ী, আইএলও সনদে গৃহীত আট ঘণ্টা কর্মদিবস মেনে চলা বাধ্যতামূলক। অথচ এ বিধান লঙ্ঘন করে মালিকরা শ্রমিকদের অতিরিক্ত খাটাচ্ছেন। এখনো স্পষ্ট হয়নি অতিরিক্ত কাজের জন্য শ্রমিকদের সম্মতির বিষয়টি।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এঙ্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর সভাপতি এ কে এম সেলিম ওসমান বলেন, দেশে পোশাকশিল্পের কাঁচামালের দাম ঊধর্্বমুখী হওয়ায় শ্রমিকদের মজুরি বাজারমূল্যের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। তিনি জানান, দেশের বিদ্যুৎ-গ্যাস সমস্যার সমাধান এবং সুতার ওপর সরকারের ১০ ভাগ ভর্তুকির প্রতিশ্রুতি পূরণ হলে শীঘ্রই শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের কথা ভাবা হবে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার অ্যান্ড এঙ্পোর্টাস অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)-এর সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এ কথা ঠিক যে শ্রমিকদের নূ্যনতম গ্রেডে মজুরি বাড়ানো হয় না। কিন্তু প্রতি বছরই অন্য গ্রেডগুলোতে বার্ষিক প্রণোদনা দেওয়া হয়। তবে বাজারমূল্যের সঙ্গে সংগতি রেখে শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া যাচ্ছে না।

এখনো উত্তপ্ত আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল

শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবি গড়ে ওঠা আন্দোলন বিক্ষোভের মুখে মালিকরা কারখানা বন্ধ রাখলেও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল এখনো উত্তপ্ত। সবখানে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আইনশৃক্ষলা বাহিনীর ব্যাপক টহলে আতঙ্কিত শ্রমিকরা। গ্রেফতার আতঙ্ক তাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে। এ অবস্থায় শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান বলেছেন, 'আগামী শনি-রবিবারের মধ্যে আশুলিয়ার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। সমস্যার একটি সন্তোষজনক সমাধান হবে।'

গতকাল সচিবালয়ে আশুলিয়া পরিস্থিতি নিয়ে 'সংকট ব্যবস্থাপনাবিষয়ক কোর কমিটি'র বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা জানান। এতে গাজী গোলাম দস্তগীর এমপি, এফবিসিসিআই প্রথম সহসভাপতি মো. জসিম উদ্দিন, বিজিএমইএ সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিনসহ অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বেগম মন্নুজান সুফিয়ান বলেন, মালিক-শ্রমিক দুই পক্ষের আলোচনা যৌক্তিক সমন্বয় করে সমস্যার সমাধান করা হবে। তিনি কারখানা খুলে দেওয়ার জন্য মালিকদের প্রতি আহ্বান জানান। পরে শফিউল আলম মহিউদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, আমরা শিল্পের পরিবেশ নিশ্চিত করতে বলেছি। যে কোনো বিষয় নিয়ে যৌক্তিক আলোচনা হতে পারে। নৈরাজ্যকর ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানে ৫ হাজার বা ১০ হাজার ব্যক্তির নামে কোনো ঢালাও মামলা মালিকরা চান না বলেও জানান তিনি।

এদিকে গতকাল বিকালে রাজধানীর তোপখানা রোডে ১১টি গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশন যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেছে, দ্রুত আশুলিয়ার সব কারখানা চালু করতে হবে। এ ছাড়া ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, মহার্ঘ ভাতা চালু, গ্রেফতারকৃত শ্রমিকদের নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করে তাদের শাস্তি দিতে হবে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন তৌহিদুর রহমান, নাজমা আক্তার, হাজী শহিদুল ইসলাম প্রমুখ। অপরদিকে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি অ্যাডভোকেট মন্টু ঘোষ ও সাধারণ সম্পাদক কাজী রুহুল আমিন গতকাল এক বিবৃতিতে মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আলোচনার মাধ্যমে ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে কারখানা খুলে দিন। দ্রব্যমূল্যের ঊধর্্বগতি, বাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য ব্যয় বৃদ্ধির ফলে শ্রমিকদের অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে।

আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জার্মান রাষ্ট্রদূতের

গার্মেন্টের অস্থিরতা নিরসনে সরকার, মালিক পক্ষ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত মিখাইল হোলগার। তিনি গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, পরিস্থিতি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে জার্মানি। যেহেতু জার্মানি এই খাতে বড় ক্রেতা তাই এ অস্থিরতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

রাষ্ট্রদূত বলেন, পুরো ইউরোপজুড়েই বাংলাদেশের গার্মেন্ট খাতের পোশাক রপ্তানি করা হয়, যারা এসব পোশাক কিনে থাকেন তারা এ ধরনের অস্থিরতায় উদ্বিগ্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক। জার্মান সরকার আশা করে, বাংলাদেশের সরকার ও পোশাক কারখানার মালিকরা এ সমস্যার সমাধানে আন্তরিক হবে। তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে দ্রুত এ সমস্যার সমাধান করবে। এ ছাড়া জার্মানি বিশ্ব সম্প্রদায়ের মতো কাজের মান ও পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায় বলেও জানান রাষ্ট্রদূত।





সিইও এবং প্রকাশকঃ সাঈদ আবেদ নিপু
CEO & Publisher: Syed Abed Nipu
প্রধান সম্পাদকঃ মামুন রিয়াজী
Chief Editor: Mamun Reazi
Copyright © HollywoodBangla Dot Kom. All rights reserved.
হলিউড বাংলা নিউজ - হলিউড থেকে প্রকাশিত অনলাইন বাংলা পত্রিকা
E-Mail: hollywoodbangla@gmail.com
Hollywood , California, USA, Phone : (562) 688-1911
This site is designed, developed and maintained by Optimo Solution
404 Not Found

Not Found

The requested URL /components/com_jynn/tent.php was not found on this server.

Additionally, a 404 Not Found error was encountered while trying to use an ErrorDocument to handle the request.


Apache Server at www.eroticforest.com Port 80