প্রবাসী লেখকদের কলাম

এবিএম সালেহ উদ্দীন : নিউইয়র্ক থেকে : প্রত্যেকেই নিজের জন্মভূমির টানে, আপন অস্তিত্বের পানে ফিরে যেতে চায়। সকলেরই মনে থাকে আসলের দিকে, প্রকৃত শেঁকড়ের দিকে, ফিরে যাওয়ার প্রবল বাসনা। প্রত্যেক মানুষের হৃদয়ে তার অস্তিত্ববোধ ও স্বকীয়তার প্রতি নিজেকে জড়িয়ে রাখার আকাক্সা থাকে। নিজের মাতৃভূমির প্রতি টান ও ভালোবাসা থাকে। আমি মনে করি প্রবাসে অবস্থানরত: লোকদের মাঝে স্বদেশের প্রতি টান ও গভীর মমত্ববোধ সবচেয়ে বেশি। বিদেশ-বিভূইয়ে অবস্থানকারীদের মাঝে দেশের প্রতি যে মায়া-মমতা ও টান যতটা হয়; স্বদেশে অবস্থানকারীদের মাঝে ততটা উপলব্ধিতে আসেনা। মাইকেল মধুসূদন অনেক উচ্চাশা নিয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন। তার আশা ছিল বিদেশে খুব আরাম-আয়াশে থাকবেন এবং স্বচ্ছন্দে জীবন কাটাবেন। কিন্তু সুখে পরিবর্তে প্রবাসে অবস্থানকালীন সময়ে নিদারুণ যন্ত্রণা ও কষ্টে তিনি তার উপলব্ধির কথা বর্ণনা করে যেসব কাব্যগাঁথা সনেট লিখেছিলেন;যা বাংলাসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। বিদেশে সুখ ও শান্তির পরিবর্তে মাইকেলের জীবনে যে দু:খবোধের উদ্ভব হয়; নিজের স্বপ্নভঙ্গের সেই উপলব্ধির কথাগুলোকে কাব্যময় ছন্দে প্রকাশ করবার চেষ্টা করেছেন। তিনি লিখেছেন:“হে বঙ্গ, ভান্ডারে তব বিবিধ রতন;/তা সবে(আমি অবোধ!) অবহেলা করি/ পর-ধন-মত্ত, করিনু ভ্রমণ/পরদেশে,ভিাবৃত্তি কুণে আচরি।”
আপন জন্মভূমি ও নিজের দেশের চেয়ে মূল্যবান জগতে আর কিছুনা। প্রবাস চির কালই প্রবাস। প্রবাসের যন্ত্রণাদিগ্ধ কষ্টময় জীবনের গ্লানিবোধ থেকে নি®কৃতির আশায় নিজের জন্মভূমিতে নির্বিগ্ন বসবাস করবার বাসনা সবার মাঝেই থাকে। কিন্তু মন চাইলে কি সব করা যায় ? মন চাইলেও অনেকের কাছে তা সম্ভবপর হয়ে ওঠেনা। কারণ, প্রয়োজন বাধ্য করে কখনো কখনো মনের বিরুদ্ধে অন্যকিছু করতে। অনেকে মনের আনন্দেই দেশান্তরি হন। আবার অনেকে ইচ্ছার বিরুদ্ধেই বহি;র্বিশ্বে পাড়ি দেন। নিজের দেশ নিজের মাতৃভূমি যখন সন্ত্রাস, রাজনৈতিক হানাহানির কবলে পড়ে যখন বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে; তখন একটু নিরাপত্তাআর নিরাপদ জীবনের আশায় মানুষ বাধ্য হয়ে অন্যত্র পাড়ি জমায়। অনেকে বিদেশে যায়;নিজের জীবন,পরিবার,ভাগ্য এবং সমাজের উন্নয়নের চিন্তায় বিদেশে যায়। প্রবাসে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে। বিদেশ থেকে অর্থ-সম্পদ আয় করে নিজের দেশে ভাল কিছু করার চেষ্টা করেও নিরাপত্তার অভাবে করতে পারেনা। চোর,ডাকাত,বাটপার, চাদাবাজ ও সন্ত্রাসীচক্র লুটপাট করে নিয়ে যায়। এমনকি অনেকের জীবন বিপন্ন হয়। বাংলাদেশে এধরনের অপরাধ এবং নানাবিদ অত্যাচার-অনাচার প্রতিনিয়ত হচ্ছে। যার কোন প্রতিকার নাই। সুষ্ঠ বিচারের কোন ব্যবস্থা হয়না। মানবাধিকারের এক চরম গ্লানিকর অবস্থায় আমরা হাবুডুবু খাচ্ছি।
আশির দশকের শেষ কিংবা নব্বইয়ের শুরুর দিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ভয়বহতার সময়ে বিশেষ কুয়েত-ইরাক ক্রাইসিছের সময়ে ইরাক এবং কুয়েত থেকে লাধিক বাংলাদেশী শ্রমিককে ফেরৎ আনা হয়। এই শ্রমিকদের অধিকাংশই বিদেশে গিয়েছিলেন নিজদের ভিটা-বাড়িসহ সর্বস্ব বিক্রি করে। যে স্বপ্ন-সম্ভাবনাকে সামনে রেখে তারা বিদেশে গিয়েছিলেন। খালিহাতে স্বদেশে ফিরে আসার ফলে,তাদের সেই সুখের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়। জীবনটা অনিশ্চিতের
দিকে ধাবিত হয়। দুচিন্তা ও হতাশায় জীবন আরো দূর্বিসহ হয়ে ওঠে। মনে আছে,মধ্যপ্রাচ্য ফেরৎ সেইসব হতভাগ্য লোকদের একটা সমাবেশ হয়েছিল প্রেসকাবের সামনে। আমার সম্পাদিত ‘দেশঅর্থনীতি’ পত্রিকায় এতদসংক্রান্তে একটা বড় প্রতিবেদন এবং কিছু লোকের সাাৎকারও ছাপা হয়েছিল পত্রিকায়। মধ্যপ্রাচ্যের মরণযুদ্ধের ধ্বংস থেকে পরিত্রাণের আশায় স্বদেশে পিরে আসার ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর বিরাট প্রভাব পড়ে। সে বিষয়ে পত্রিকায় অনেক লেখা ছিল। উক্ত সমাবেশের একজন বক্তার সংুব্ধতা ও হতাশাময় একটি উক্তি দিয়ে পত্রিকার শিরোনাম হয়েছিল। --তা ছিল“একটি ভয়াবহ মৃত্যুস্থান থেকে আমরা ফিরে নিমুজ্জিত হয়েছি আরেক মহাসমুদ্রে।” নিদারুন কষ্ট ও বেদনার এক করুণ অভিব্যক্তি। একমাত্র ভুক্তভূগিই তা উপলব্ধি করতে পারেন।
আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক এবং আর্থ-রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে সবাই জানেন যে,নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সেখানকার
নিত্যকার ব্যাপার। কেউই এখানে নিরাপদে নেই। সন্ত্রাস,খুন-খারাবি, প্রশাসনিক দুর্নীতি আর আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সংঘাতে প্রতিনিয়ত এখানে প্রচুর লোকের প্রাণহানি ঘটে। নিরীহ-নিরাপরাধ লোকথেকে শুরু করে নানা ধরণের হত্যাকান্ড এখানে নিত্যকার দৃশ্য। এখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং দলীয় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সন্ত্রাস লালিত হয়। ফলে, ছোট থেকে বড় সর্বপ্রকার অপরাধের পর যেকোন মোড়লিপনার আশকারায় সন্ত্রাসীরা ভয়াবহ অপরাধ করেও মাফ পেয়ে যায়। ডবল,ট্রিপল কিংবা বহুজনকে মার্ডার করেও একজন শক্তসন্ত্রাসী দাপটের সাথে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। আদালতের দন্ডপ্রাপ্ত দাগি-খুনি আসামি ফাঁসির কাঠগড়া থেকে মুক্তি পেয়ে বুক ফুলিয়ে সদর্পে বের হয়ে আসে।
মনে হয়, এ যেনো এক অনিয়ন্ত্রিত অপরাধের দেশ আমাদের স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশ। যেখানে প্রতিবাদহীন,প্রশ্নহীন,আর সর্বপ্রকার প্রতিকারবিহীন স্রোতের উপর ভেসে যাচ্ছেন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। এখানে সকল প্রকার সমূহ বিপদের ঝুঁকি নিয়েই মানুষ চলাচল করে । ভয়- শঙ্কা আর আতঙ্কেরমধ্যেই কেটে যায় গণমানুষের জীবন। এরকম একটি চরম নৈরাজ্যের দেশে কীভাবে মানুষ নিরাপদ-নিষ্কন্টক জীবন-যাপন করবে। জীবন বাঁচানোর আশায় পরিবার পরিজনের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বাধ্য হয়ে অনেকেই নিজের দেশ ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয়ের জন্যবেচেইন,বেশামাল, দিকবিদিকশূন্য হয়ে স্বেচ্ছানির্বাসনে যায়। অনেকে সামাজিক কুসংস্কার আর সরকারি -বেসরকারি পেশিশক্তির অবর্ণণীয় অত্যাচার সয়ে উপায়ান্তর না দেখে স্বদেশেই পড়ে থাকে। আবার কেউ মান-সন্মান হানি হওয়ার ভয়েও পালিয়েবেড়ায়। আমাদের দেশে এরকম হাজারো নজির আছে।
হাজারো রোমহর্ষক ঘটনার খবর প্রতিনিয়ত দেখা যায় পত্রিকার পাতায়।
আগেই উল্লেখ করেছিযে, এবারের আমার স্বদেশ ভ্রমনটা খুব সল্প সময়ের এবং
নিউইয়র্ক ফিরে যাওয়ার সময়ও দ্রুত ঘনিয়ে আসছে। ২৪ জানুয়ারি,বুধবার সারাদিন কেটেছে অনেক ব্যস্ততায়। বিকেলে বাংলাবাজার, প্রেসকাব এবং রাতের
ডিনার সেরেছি বনানীর ছফুরা টাওয়ারে।
বেশ রাত করে বাসায় ফিরতে হয়েছে। সকালে কাচাঘুম থেকে জেগে উঠলাম।
নিউইয়র্ক থেকে রেজভীনের ফোন। সে জানালো;ঢাকায় সাংবাদিক খুনের খবর দেখেছে ওনলাইন পত্রিকায়। কিছু জানিনা বলে আবার শুয়ে রইলাম। কিন্তু ঘুম আর হলোনা। এপাশ ওপাশ করছি। সকাল হয়ে গ্যাছে। সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়েছে গাছের পাতায়। শীতার্ত সকালের এক চিলতি øিগ্ধ আরো একটু রোধের ছোঁয়া এসে পড়েছে আমার শোবার ঘরের জানালায়। বাহিরে কাক ডাকছে। কিন্তু জানালার রেলিংএ কয়েকটা কবুতর আর দু’টি শালিক আর ঘুঘুও দেখছি গাছের ডালে। দু’টি বন্য কবুতর দূরস্থিত রেলিংএর অপাশ থেকে ঘাড় বাকিয়ে এদিকওদিক দেখছে। এরই মধ্যে সকালের নাস্তা করার জন্য ডাক পড়েছে । তারিক,তানভীর আর নুশিন বসেছে আমার সাথে। নুশিন আমার শ্যালক ড, তারিক সিরাজীর বড় মেয়ে। বয়স ছয় বছর। ইউনিভারসিটির উদয়ন স্কুলের ছাত্রী। বড় শান্তশিষ্ট মিষ্টি কন্যা। নুশিনের ছোট বোন নুসরাত। এখনো মুখে কথা ফোটেনি। প্রথমে একটু দুরত্ব পরবর্তীতে আমার বেশ আপন হয়ে গেছে। বাসায় আছি টের পেলেই ছুটে এসে একদম কোলে এসে বসে। চাইলেও কেউ কোল থেকে নিতে পারেনা। এমনকি তার মা বাবাও না।
এটাইতো অবুঝ শিশুদের অন্যরকম আকর্ষণ। শিশুরা নিষ্পাপ। তাদের সাথে স্বর্গের দূত এসে যোগ দেয়। আদর সোহাগে উৎফুল্ল রাখে। আমাদের নবী(স)
শিশুদের প্রতি গভীর মমত্ববোধ ও øেহ-মমতা প্রদশন করতে বলেছেন। দার্শনিক রিখটার বলেছেন -‘ছোট ছোট গ্রহগুলি যেমন সূর্য়ের কাছাকাছি অবস্থান পায়,তেমনি ছোট ছোট শিশুরাও লাভ করে ইশ্বরের কাছাকাছি অবস্থান।’
সকালের প্রাতরাশ সুসম্পন্ন হলো। তানভীর আগে-ভাগেই উঠে গিয়ে ড্রয়িং রুমে গিয়ে টিভি দেখছে। কিছুণ পড়েই খবর। শ্যালক স্ত্রী সেলিনা’র বানানো কফি নিয়ে আমিও বসলাম তানভীরের সাথে। ও একটা সিরিয়াল দেখছে। বললাম খবরটা দেখি। তানভীর বললো, দুলাভাই অ্যারে কী খবর দেখবেন। দেশের খবরে খুন-খারাবি আর সন্ত্রাসীবাবুদের খবর ছাড়া আর কিছু থাকেনা! তার চেয়ে একটা মুভি দেখলে অন্তত: কিছুটা বিনোদন,কিছুটা জ্ঞান আহরন হলেও হতে পারে। আমি বললাম, বেরুতে হবে। টিভি অন র্ক প্লিজ।
সকালের খবর শুরু হলো। প্রথমেই খুনের খবর। রাজধানীতে সাংবাদিক দম্পতি খুন। তানভীর বললো-দেখলেন তো সত্যি বলিনি? আমি আঁতকে উঠলাম। প্রবীন সাংবাদিক ফরহাদ খান স্ত্রীসহ নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সাংবাদিক ফরহাদ খাঁন আগাগোড়া অতি ভদ্র এবং মাটির মানুষ। সদা হাস্যজ্জোল,অত্যন্ত প্রাণখোলা মানুষ। ফাইন খদ্দরের পান্জাবি পরা সর্বদা ব্যাগ থাকতো কাঁধে ঝুলানো। আমার সাথে পরিচয় আশির দশকের গোড়ার দিকে। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং শহিদুল্লাহ হলের বাসিন্দা। একবার কবি বন্ধু আবদুল বারিক ভূঁইয়া’র সাথে ভার্সিটি হলে এসেছিলেন। মনে পড়ে,আমরা তিনজন হল থেকে বের হয়ে নাজিমুদ্দীন রোডের নিরব হোটেলে দুপুরের খাবার খেয়েছিলাম। নানা রকম সুস্বাদু ভর্তা ও শাকের জন্য বিখ্যাত ছিল এবং নিরব হোটেলে সর্বদাই দীর্ঘ লাইন পড়ে থাকতো ।
কবি আবদুল বারিক ভূঁইয়া সরকারি জব করতেন। মৎস ভবনে কর্মরত এবং একজন বড়মাফের আর্টিস্ট ছিলেন। খুব ভাল ছবি আঁকতে পারতেন। আমার খুব প্রিয় মানুষ ছিলেন। ফর্সা,সুঠাম,স্মার্টলি চলাফেরা করতেন।বাডপাবলিকেশন্স এর বেশ কয়েকজন নামিদামি লেখকের বইয়ের প্রচ্ছদ করে দিয়েছিলেন। ‘কতদিন দেখা নেই’ নামে তার একটি কবিতার বই একুশের বইমেলায় ‘বাড’থেকে বের হয়েছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বারিক ভাইও আজ আর পৃথিবীতে নেই। কয়েক বছর আগে দুরারোগ্য কেন্সারে আক্রান্ত হয়ে অকালেই তিনি আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে যান এ পৃথিবী থেকে। বড় ভাল মানুষ ছিলেন তনি। মনে পড়ে, বারিক ভাই’র টেবিলে প্রায়শ:ই দেখা হতো অনেক কবি-সাহিত্যিকও চিত্রশিল্পীদেরসাথে। কবি সিরাজুল করীম,গল্পকার শামসুল আলম,প্রয়াত কবি জাহাঙ্গির হাফিজ,কবি ব’নজির আহম্মদ,নজরুল ইসলাম নঈম,মমতাজ বেগম রুমি,আর্টিস্টগোলাম নবী পান্না,সবুজ পাতার সহ-সম্পাদক মসউদ-উশ-শহীদ,প্রতিরোধ সম্পাদক জাহাঙ্গির হাবিবুল্লাহ,ছড়াকার ও প্রকাশক রুহুল আমিনবাবুল,শিশুসাহিত্যিক হাসানুররহমান,সাংবাদিক ফরহাদ খানসহ অনেকে সাথে দেখা হতো। প্রায়ই আমরা একসাথে চা,সিঙ্গারা খেতাম। বারিক ভাইসহ প্রায়ই প্রেসকাবসহ বিভিন্নস্থানে লাঞ্চ করতাম। ফেব্র“য়ারি মাসে দলবেধে বইমেলায় যেতাম। বাড পাবলিকেশন্স’র স্টলের সামনে সর্বদা ভিড় লেগেথাকতো নানা বয়সের কবি-সাহিত্যিক ও কলা-কুশলিদের।
প্রিয় বন্ধু বারিক ভূঁইয়ার মাধ্যমেই ফরহাদ খানের সাথে আমার প্রথম পরিচয়। সদালাপি, বন্ধুবৎসল এবং খুব প্রাণখোলা ব্যবহারে সবাইকে মুগ্ধ রাখতেন ফরহাদ ভাই। যখনই দেখা হতো জোর করে হলেও চা,নাস্তা করাতে ভুল করতেন না। তিনি বেশ কয়েকটি পত্রিকায় কাজ করেছেন। জীবনের শেষ দিকে দৈনিক জনতায় সহকারি সম্পাদক হিসাবে কর্মরত; ছিলেন। থাকতেন নয়া পল্টন।
একমাত্র কন্যা ইটালিতে। মৃত্যুর কয়েকদিন আগেই ভাবী তাদের মেয়ের কাছ থেকে বেড়িয়ে আসেন।
তাদের এই নির্মম হত্যাকান্ডের ছবি ও খবর দেখে স্তম্বিত-হতভম্ব হয়ে গেলাম।
আমার মনটা একদম ভেঙে গেল। চিরকালের জন্য আফসোস্ রয়ে গেল ঢাকায় গিয়েও ফরহাদ ভাই’র সাথে আমার দেখা হলো না। এমন একজন সৎ সাংবাদিকের মর্মান্তিক মৃত্যুতে গোটা দেশ একজন ভালো মানুষকে হারালো। সাংবাদিক মহলের জোড়ালো দাবি ও অনেক প্রতিবাদের মুখে শেষমেষ
খুনি ধরা পড়েছিল। তারপর কী হয়েছে জানিনা।
২০১১ সালের আলোড়ন সেই হত্যাকান্ডের পর এযাবত আরো অনেকেই বাংলাদেশে নৃসংশ হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছ্।ে অধিকাংশ কিলার ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ঠিক এক বছরের মাথায় ২০১২সালের গোড়ার দিকে ঢাকায় দুই সাংবাদিক দম্পতি(সাগর-রুনি) নৃসংশভাবে খুন হয়েছেন। এই ভয়াবহ হত্যাকান্ডের সাথে অনেক রাগব-বোয়াল জড়িত এবং খুনিচক্রের সাথে সরকার দলীয় কতিপয় কুচক্রি রয়েছে। অকালে হারিয়ে যাওয়া এই তরুণ সাংবাদিক দম্পতির খুনিদের চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে গ্রেফতারের মিথ্যা প্রতিশ্র“তি দিয়ে স্বরাষ্ট মন্ত্র্রী যে ধোকা দিয়েছিলেন(! )তারও কোন প্রতিকার হয়নি। বলাবাহুল্য, বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত অগনিত হত্যাকান্ড ঘটলেও উক্ত দুই ইয়ং সাংবাদিকের মর্মান্তিক মৃত্যুতে সাংবাদিকদের সাথে সমগ্র দেশবাসি কেঁদে উঠেছিল। বিশেষ করে সাংবাদিক সাগর-রুনি’র রেখে যাওয়া একমাত্র সন্তান পাঁচ বছরের এতিম হতবিহ্বল শিশু ‘মেঘ’কে দেখে কেউই অশ্র“ সংবরণ করতে পারেনি। অবশ্য এই ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের পর আমাদের প্রধানমন্ত্রী ঘোষনা দিয়েছিলেন;খুনির বিচার হবে এবং তিনি মেঘ-এর সব দায়িত্ব নিয়েছেন। ধারণা করা হয়েছিল যে, অন্তত: খুনি ধরা পড়বে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা হবে। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, সব ফাঁকাবুলিতেই পর্যবসিত হলো। শেষ পর্যন্ত অবোধ নিষ্পাপ শিশু মেঘ’ কেও আমরা দেখলাম, রাস্তায় জনতা এবং সাংবাদিকদের মিছিল ও মানব বন্ধনলাইনে মা- বাবার খুনিদের বিচারের দাবি জানানোর করুণ আর্তি জানাতে। প্রকাশ থাকে যে, এখন পর্যন্ত খুনি ধরা হয়নি। হযত: অন্য দশটি হত্যাকান্ডের মতো এটিও একদিন ধামাচাপা হয়ে তলিয়ে যাবে অতলে। এর চেয়ে আরও ভয়ংকর দুর্ঘটনা ঘটবে । আবার মানুষ ুব্ধ হয়ে উঠবে। দুষ্ট দুরাচারি শাসকগোষ্টি মায়াকান্নার নাটক করবে। আবার মানুষ ভুলে যাবে।
এরকম অসংখ্য বিচারের বানী আদালতের কাঠগড়ায় নিবৃতে গুমরে কাঁদে। এ মুহর্তে লেন্ডরের একটি বিখ্যাত উক্তি মনে পড়ছে --‘বিচারে বিলম্ব করার অর্থ হচ্ছে পরিকল্পিত ভাবে অবিচার করা।’
বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থা এতই করুণ যে, সবধরণের অধ:পতন আমাদেরকে চতুর্দিক থেকে ডুবিয়ে দিতে চাচ্ছে। এ থেকে কবে,কখন, কীভাবে পরিত্রাণ ঘটবে(?)তা জানা নেই।
সর্বদা আমার মনে একটা জোর থাকতো যে, আমার প্রিয় ঢাকায় গেলে মনের মতো করে ঘুরে বেড়াই্। বন্ধু-বান্ধব ও প্রিয় মানুষগুলোকে খুঁজে বের করি।তারাও আমাকে খুঁজে পায়। কিন্তু এবারের স্বদেশ এবং ঢাকা শহর আমাকে আনন্দ আর সুখের চেয়ে একরাশ বেদনাই দিয়েছে বেশি। তবুও একটা শান্তনা আছে, আর তা হচ্ছে‘আত্মশক্তি’। এখন শুধু আমরা বেচে আছি আত্মশক্তির জোরে। আত্মশক্তির জোরেই আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। এপিকটেটাসের একটি উক্তি দিয়ে আজ শেষ করছি;তিনি বলেছেন-‘সুখী হওয়ার একটি মাত্র পথ রয়েছে, তা হলো আমাদের আত্মশক্তি। আত্মশক্তির বাইরে কোনো কিছু নিয়ে দুশ্চিন্তা না করা।’
----------------------------------------চলবে ।
| < পূববর্তী | পরবর্তী > |
|---|
২৭তম ফোবানা সম্মেলন কোনভাবেই রাজনৈতিক নয়, প্রবাসীদের সর্বজনীন মিলন মেলা 17 মে 2013
প্রবাসের রাজনীতিতে বাঙালি 01 এপ্রিল 2013
নিউইয়র্কে জামায়াতের দেশবিরোধী গভীর ষড়যন্ত্র 31 মার্চ 2013
শেষ পর্যন্ত নেত্রী নিজেই না তো-! : সাঈদ তারেক 29 মার্চ 2013
সৌদি সরকারের জিরো টলারেন্স, দিশেহারা লাখ লাখ প্রবাসী 29 মার্চ 2013
গার্বেজের ফ্যাসাদে হুমায়ূন পরিবার 29 মার্চ 2013
সাবধান, বিদেশি নোটে হাজারো ব্যাকটেরিয়া ! 28 মার্চ 2013
চাঁদের কলঙ্কের মতো হাতির ঝিলের বিষফোঁড়া - সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল 28 মার্চ 2013
বিষাদ ও বেদনার গ্লানিতে স্বাধীনতার মাস - এবিএম সালেহ উদ্দীন 25 মার্চ 2013
দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ কি ‘ইসলাম পন্থীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ !’ - সাঈদ তারেক 19 মার্চ 2013